মুমিনের হারানো কিছু নেই: এক অতল প্রশান্তির পথরেখা মোঃ শামছুদ্দিন

 












মুমিনের হারানো কিছু নেই: এক অতল প্রশান্তির পথরেখা

মো: শামছুদ্দিন

 



বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

 






জীবন মানেই কি কেবল পাওয়া আর হারানো? আমরা আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি ধাপে কিছু না কিছু আঁকড়ে ধরতে চাই। কখনো সেই মায়া হয় কোনো প্রিয় মানুষের জন্য, কখনো এক মুঠো সম্পদের জন্য, আবার কখনো বা নিজের গড়া ছোট্ট কোনো স্বপ্নের জন্য। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর স্রোতে যখন সেই প্রিয় বস্তুগুলো বালির বাঁধের মতো ভেঙে যায়, তখন মানুষের বুক চিরে বেরিয়ে আসে এক দীর্ঘশ্বাস "সব হারিয়ে গেল!"

কিন্তু আপনি যদি একজন মুমিন হন, তবে আপনার ডিকশনারিতে 'হারানো' শব্দটি বড়ই বেমানান। মুমিনের জীবন এক অদ্ভুত জাদুর আয়না, যেখানে প্রতিটি বিয়োগ আসলে একটি মহিমান্বিত যোগফল। এই পৃথিবীতে আমরা যা কিছু হারাই, তার প্রতিটিই আসলে পরকালের ব্যাংকে জমা হওয়া একেকটি স্থায়ী আমানত।

যখন আপনি মনে করবেন আপনার চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে, আপনার খুব প্রিয় কেউ আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে, কিংবা আপনার বছরের পর বছরের পরিশ্রম এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেছেতখন এই লেখাটি আপনাকে মনে করিয়ে দেবে যে, আপনার রব আপনার থেকে যা কেড়ে নিয়েছেন তা কেবল আপনাকে আরও বড় কিছু দেওয়ার জন্য।

আসুন, আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির চশমাটা বদলে নিই। হারানোর হাহাকার ছাপিয়ে শুনি প্রশান্তির সেই সুর "মুমিনের হারানো কিছু নেই।"

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


মুমিনের হারানো কিছু নেই: এক অতল প্রশান্তির পথরেখা

মানুষের জীবনে সুখ এবং দুঃখের অনুভূতি অনেকটা নির্ভর করে তার চশমার ওপর। সে কোন চশমা দিয়ে জগতকে দেখছে, তার ওপর ভিত্তি করেই তার প্রতিক্রিয়া নির্ধারিত হয়। একজন বস্তুবাদী মানুষের কাছে 'হারানো' মানেই শূন্যতা, কিন্তু একজন মুমিনের কাছে 'হারানো' হলো একটি আধ্যাত্মিক উত্তরণ। কীভাবে একজন মুমিন তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে হারানোর বেদনাকে প্রশান্তিতে রূপান্তর করতে পারে।

 মালিকানা বনাম আমানত :

মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে যখন সে বুঝতে পারে যে, সে এই পৃথিবীতে কোনো কিছুরই প্রকৃত মালিক নয়। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ আমাদের শেখায় "এটি আমার গাড়ি," "এটি আমার সন্তান," "এটি আমার ক্যারিয়ার।" এই 'আমার' শব্দটি যখন হৃদয়ে গেঁথে যায়, তখন সেই জিনিসটি হাতছাড়া হলে মানুষ মনে করে তার অস্তিত্বের একাংশ ছিঁড়ে গেছে।

কিন্তু ইসলাম বলে, এই মহাবিশ্বের একমাত্র মালিক আল্লাহ।

"আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই।" (সূরা আল-ইমরান: ১০৯)

আমানতের দর্শন :

মুমিন মনে করে তার হাতের সম্পদগুলো হলো আল্লাহর দেওয়া 'আমানত'। আপনি যদি কোনো ব্যাংকের ক্যাশিয়ার হন এবং দিনের শেষে আপনার হাতে থাকা কয়েক কোটি টাকা ব্যাংকের ভল্টে জমা দিয়ে দেন, তবে কি আপনি কাঁদবেন যে আমি অনেক টাকা হারিয়ে ফেলেছি? অবশ্যই না। কারণ আপনি জানতেন এই টাকা আপনার নয়, আপনি শুধু এর রক্ষণাবেক্ষণকারী ছিলেন।

ঠিক তেমনি, মুমিনের কাছে তার প্রিয়জন বা সম্পদ হলো আল্লাহর দেওয়া আমানত। আল্লাহ যখন তা নিয়ে যান, মুমিন তখন বলে "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন" (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং আমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাব) । এই বাক্যের গূঢ় অর্থ হলো আমি যখন নিজেই আল্লাহর, তখন আমার সম্পদ আমার হয় কীভাবে? মালিক তার জিনিস নিয়ে গেছেন, এতে অভিযোগের কী আছে?

হারানোর মাঝে লুকায়িত লাভ: গুনাহের কাফফারা

মুমিনের ডিকশনারিতে 'লস' বা লোকসান বলে কিছু নেই। আমরা যখন দুনিয়াবি কোনো জিনিস হারাই, আমরা কেবল তার বাহ্যিক রূপটি দেখি। কিন্তু এর আধ্যাত্মিক প্রভাব বিশাল।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে ক্লান্তি, রোগ, শোক, দুঃখ, কষ্ট ও দুশ্চিন্তা আপতিত হয়, এমনকি তার গায়ে যে কাঁটাটি ফোটে, তার বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।" (সহীহ বুখারী)

একটি নতুন সমীকরণ :

ধরুন, আপনি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ১০০ টাকা হারিয়ে ফেললেন। এটি দুনিয়াবি ক্ষতি। কিন্তু এই ১০০ টাকা হারানোর ফলে যে মনোকষ্ট আপনার হলো, তার বিনিময়ে আল্লাহ আপনার আমলনামা থেকে হয়তো এমন একটি গুনাহ মুছে দিলেন যার শাস্তি ছিল পরকালের কঠিন আগুন। এখন আপনিই বিচার করুনসামান্য কাগজের নোট হারানো কি বড় ক্ষতি, নাকি চিরস্থায়ী জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাওয়া বড় জয়?

একজন মুমিন এই সমীকরণটি বোঝে। তাই সে যখন কিছু হারায়, সে মনে মনে ভাবে "যাক, এই হারানোর উছিলায় হয়তো আল্লাহ আমার বড় কোনো বিপদ কাটিয়ে দিলেন অথবা আমার গুনাহ হালকা করে দিলেন।"

অপ্রাপ্তির আড়ালে আল্লাহর সুরক্ষা

আমরা অনেক সময় কোনো জিনিস না পেলে বা হারিয়ে ফেললে ভেঙে পড়ি কারণ আমরা জানি না সেই জিনিসটি আমাদের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর ছিল। আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমাবদ্ধ।

শিশুর উদাহরণ :

একটি শিশু যখন আগুনের শিখা দেখে তা ধরতে চায়, আর তার মা যখন তাকে টেনে সরিয়ে নেয়, শিশুটি তখন কান্না করে। সে মনে করে তার মা তাকে একটি সুন্দর খেলনা থেকে বঞ্চিত করল। শিশুটি জানে না যে, মা তাকে আসলে জীবননাশের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য সেই মায়ের চেয়েও সত্তর গুণ বেশি দয়ালু। কুরআন মজিদে আল্লাহ বলেন:

"তোমরা যা অপছন্দ করো, হয়তো তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর তোমরা যা পছন্দ করো, হয়তো তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।" (সূরা বাকারা: ২১৬)

হয়তো যে চাকরিটি আপনি পাননি, সেটি পেলে আপনি অহংকারী হয়ে যেতেন অথবা হারামে লিপ্ত হতেন। হয়তো যে মানুষটি আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে, সে আপনার দীর্ঘমেয়াদী অশান্তির কারণ হতো। মুমিন বিশ্বাস করে, আল্লাহ যা কেড়ে নিয়েছেন তা আসলে তাকে রক্ষার জন্যই নিয়েছেন।

দুনিয়া: একটি ট্রানজিট লাউঞ্জ

দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আরেকটি বড় ধাপ হলো দুনিয়ার গুরুত্বকে সঠিক মাপে পরিমাপ করা।

কল্পনা করুন, আপনি এয়ারপোর্টের ট্রানজিট লাউঞ্জে বসে আছেন। সেখানে আপনার খুব পছন্দের একটি চেয়ার ছিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আপনাকে বিমানে উঠতে হলো এবং চেয়ারটি ছেড়ে দিতে হলো। আপনি কি বিমানে বসে কাঁদবেন যে "হায়! আমি চেয়ারটি হারিয়ে ফেললাম"? কখনোই না। কারণ আপনার গন্তব্য হলো আপনার বাড়ি, এয়ারপোর্ট নয়।

মুমিনের কাছে দুনিয়া হলো সেই ট্রানজিট লাউঞ্জ। আর আখেরাত হলো তার আসল বাড়ি। ট্রানজিটে কিছু হারিয়ে গেলে মুমিন বিচলিত হয় না, কারণ সে জানে তার আসল সম্পদ তার গন্তব্যে (জান্নাতে) সংরক্ষিত আছে।

রাসূল (সা.) বলেছেন:

"দুনিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক একজন পথিকের মতো, যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল, তারপর তা ছেড়ে চলে গেল।" (সুনানে তিরমিজি হাদীস ২৩৭৭)

যখন এই জগতকে আপনি স্রেফ একটি ছায়া মনে করবেন, তখন ছায়া সরে গেলে আপনার মনে কোনো আক্ষেপ থাকবে না।

 'কেন আমি?' বনাম 'কেন আমি নয়?'

বিপদে পড়লে মানুষের মুখ দিয়ে যখন প্রথম শব্দ বের হয় "কেন আমার সাথেই এমন হলো?", তখন এর পেছনে অবচেতনভাবে একটি দাবি কাজ করে। সেটি হলো: "আমি তো ভালো মানুষ, আমি তো নামাজ পড়ি, তবে আমার জীবন তো নিখুঁত  হওয়ার কথা ছিল।" এখানেই মানুষ ভুল করে। সে মনে করে দুনিয়াতে তার নেক আমল বা ভালো ব্যবহারের বিনিময়ে সে একটি 'বিপদমুক্ত' জীবনের গ্যারান্টি পেয়েছে। কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়, দুনিয়াতে ভালো মানুষদের ওপর পরীক্ষা আরও বেশি আসে।

মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ: যখন আমরা 'কেন আমি' বলি, তখন আমরা পরোক্ষভাবে আল্লাহর ইনসাফ নিয়ে প্রশ্ন তুলি। আমরা শয়তানের সেই পুরনো ফাঁদে পা দিই, যেখানে সে মানুষকে বোঝাতে চায় যে "দেখো, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন না, ভালোবাসলে কি এমন কষ্ট দিতেন?" এই চিন্তা থেকেই মানুষের মনের প্রশান্তি হারিয়ে যায় এবং সে ডিপ্রেশনের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়।

একজন প্রকৃত মুমিন যখন চারদিকে তাকায়, সে দেখে মহাবিশ্বের কোটি কোটি সৃষ্টিকে। সে নিজেকে আলাদা বা বিশেষ কেউ মনে করে না বরং নিজেকে আল্লাহর এক নগণ্য গোলাম মনে করে। তার চিন্তা হয় এমন:

"এই পৃথিবীতে কত নিরপরাধ শিশু বোমার আঘাতে মারা যাচ্ছে, কত মানুষ ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছে, কত মানুষের শরীরে ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে। তারা কি আমার চেয়েও খারাপ মানুষ ছিল? নিশ্চয়ই না। তবে আল্লাহ যদি তাদের ওপর পরীক্ষা দিতে পারেন, তবে আমি কেন পরীক্ষার বাইরে থাকব?"

একজন ছাত্র যেমন বলতে পারে না "কেন আমাকে পরীক্ষা দিতে হবে?", তেমনি একজন মুমিন জানে এই দুনিয়ায় আসার প্রধান শর্তই হলো পরীক্ষা দেওয়া। "কেন আমি নয়?"এই প্রশ্নটি মানুষকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে আসে। এটি অহংকার ভেঙে চুরমার করে দেয়।

মুমিন চিন্তা করে, আল্লাহ আমাকে চোখ দিয়েছেন, কান দিয়েছেন, কথা বলার শক্তি দিয়েছেন। গত ৩০-৪০ বছর আমি সুস্থ ছিলাম, তখন তো একবারও প্রশ্ন করিনি "কেন আমি এত সুখে আছি?"তবে আজ এক বছরের অসুস্থতায় কেন প্রশ্ন করছি "কেন আমি কষ্টে আছি?"

যখন আপনি নিজেকে "কেন আমি" প্রশ্নের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন, তখন আপনি অন্যের দুঃখ বুঝতে শুরু করেন। আপনি দেখেন যে আপনি একা নন, পুরো মানবজাতিই কোনো না কোনো যুদ্ধে লিপ্ত। এই বোধ আপনাকে অন্যের প্রতি দয়ালু করে তোলে। আপনার নিজের কষ্ট তখন ছোট মনে হতে শুরু করে।

বিপদে পড়লে মানুষের সাধারণ প্রতিক্রিয়া হয় হাহাকার করা। কিন্তু "কেন আমি নয়" চিন্তা করা মানুষটি উল্টো শুকরিয়া আদায় করে। সে বলে "আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে পঙ্গু করেননি, কেবল সামান্য আর্থিক ক্ষতি করেছেন। তিনি চাইলে তো আমার প্রাণও নিতে পারতেন।" এই মানসিকতাকে বলা হয় 'মাইনাস ক্যালকুলেশন'। অর্থাৎ যা হারিয়েছে তা না দেখে, যা যা হারাতে পারত কিন্তু হারায়নি, তার হিসাব করা।

শয়তান চায় আমরা আল্লাহকে কেবল একজন 'শাস্তিদাতা' হিসেবে দেখি। কিন্তু "কেন আমি নয়" চিন্তাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ আমাদের অনেক দিয়েছেন। এই সামান্য কষ্টটি হয়তো কোনো বড় গুনাহ থেকে পবিত্র করার একটি প্রক্রিয়া। ফলে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাস আরও বৃদ্ধি পায়।

হাসপাতালের সেই বৃদ্ধ :

একবার এক ব্যক্তি খুব আক্ষেপ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক বুড়ো মানুষের সাথে দেখা করতে গেলেন। বুড়ো মানুষটির একটি পা কেটে ফেলা হয়েছে। আক্ষেপকারী ব্যক্তি বললেন, "আহারে! আপনার সাথে এমন কেন হলো? আপনি তো খুব ভালো মানুষ ছিলেন।"

বৃদ্ধ লোকটি মুচকি হেসে বললেন, "বাবা, গত সত্তর বছর আল্লাহ আমাকে দুটো পা দিয়ে হাঁটিয়েছেন। আমি তো কোনোদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে বলিনি 'আল্লাহ, কেন আমাকে দুটো পা দিলেন? আমি তো এত কৃতজ্ঞতা আদায়ের যোগ্য নই।' আজ যদি আমার একটি পা তিনি নিয়ে নেন, তবে আমার কি অধিকার আছে অভিযোগ করার? তিনি তো চাইলে দুটোই নিতে পারতেন। এখনো তো একটা পা দিয়ে আমি ওজু করতে পারছি, আলহামদুলিল্লাহ!"

 

এই বৃদ্ধটি "কেন আমি"র অন্ধকার থেকে বের হয়ে "কেন আমি নয়" এর আলোতে পৌঁছেছেন। আর এটাই হলো মুমিনের আসল সার্থকতা।

আপনার জীবনের প্রতিটি সংকটে যখন আপনার মন বিলাপ করতে চাইবে, তখন মনের লাগাম টেনে ধরুন। নিজের ভেতরের সেই অবাধ্য সত্তাকে বলুন "আমি তো এই বিশাল মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্র বালুকণা মাত্র। আমার চেয়েও কত নেককার মানুষ কত বড় বিপদে আছেন। আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা-ই আমার পাওনার চেয়ে বেশি।"

মনে রাখবেন, আপনি যখন অভিযোগ  করা বন্ধ করবেন, ঠিক তখন থেকেই আপনার প্রশান্তি  শুরু হবে। মুমিনের হারানো কিছু নেই কারণ সে অভিযোগের বদলে কৃতজ্ঞতাকে নিজের পোশাক বানিয়ে নিয়েছে

মূসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা: অদৃশ্যের রহস্য

আমরা যখন কোনো কিছু হারাই, তখন আমরা কেবল 'ঘটনা' দেখি, তার 'পরিণতি' দেখি না। সূরা কাহাফে বর্ণিত মূসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর সফরটি হলো হারানোর দর্শনের ওপর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাঠ। সেখানে খিজির (আ.) তিনটি কাজ করেছিলেন যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে ছিল চরম ক্ষতি:

নৌকায় ছিদ্র করা (সম্পদের ক্ষতি): একদল দরিদ্র মানুষের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম ছিল একটি নৌকা। খিজির (আ.) সেটি ভেঙে দিলেন। মালিকদের কাছে এটি ছিল অপূরণীয় ক্ষতি। তারা হয়তো তখন ভাবছিল, "আল্লাহ আমাদের সাথেই কেন এমন করলেন?"

রহস্য : সামনের বন্দরে এক জালিম রাজা ভালো নৌকাগুলো ছিনতাই করছিল। নৌকাটি ত্রুটিযুক্ত হওয়ার কারণে রাজা সেটি নিল না। ফলে নৌকাটি তাদের কাছেই রয়ে গেল।

শিক্ষা : আপনার সম্পদ যখন কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন হয়তো আল্লাহ আপনাকে আরও বড় কোনো 'ছিনতাই' বা ধ্বংস থেকে রক্ষা করছেন।

পুত্রসন্তানকে হত্যা (প্রাণের ক্ষতি) : এটি ছিল সবচেয়ে হৃদয়বিদারক। খিজির (আ.) একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করলেন। বাবা-মায়ের কাছে এর চেয়ে বড় শোক আর কী হতে পারে? তারা হয়তো সারাজীবন এই হারানোর ক্ষত বয়ে বেড়িয়েছেন।

রহস্য : আল্লাহ জানতেন ওই সন্তানটি বড় হয়ে কাফের ও অবাধ্য হতো এবং তার বাবা-মাকেও গোমরাহ করে ফেলত। আল্লাহ তাদের তার চেয়েও উত্তম এক সন্তান দিতে চেয়েছিলেন।

শিক্ষা : কখনো কখনো আল্লাহ আমাদের থেকে এমন প্রিয় কাউকে সরিয়ে নেন, যা আমাদের ঈমানকে ধ্বংস করে দিতে পারত। হারানোর সেই বেদনাই আসলে আমাদের জান্নাতের পথ সুগম করে।

ভেঙে পড়া দেয়াল মেরামত (শ্রমের মূল্য না পাওয়া) : খিজির (আ.) ও মূসা (আ.) ক্ষুধার্ত থাকা সত্ত্বেও একটি জনপদে বিনা পারিশ্রমিকে দেয়াল গেঁথে দিলেন।

রহস্য: ওই দেয়ালের নিচে দুই এতিম শিশুর গুপ্তধন লুকানো ছিল। দেয়ালটি ভেঙে পড়লে মানুষ তা চুরি করে নিত। আল্লাহ চাইলেন তারা বড় হওয়া পর্যন্ত সম্পদটি সুরক্ষিত থাকুক।

শিক্ষা: আপনার পরিশ্রম বা পাওনা টাকা যখন আপনি ফিরে পান না, তখন বুঝবেন আল্লাহ তা অন্য কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে বা ভবিষ্যতে আরও বড় মঙ্গলের জন্য জমিয়ে রেখেছেন।

 

 

হারানোর আড়ালে প্রাপ্তি :

মিস হওয়া ফ্লাইট এবং অলৌকিক রক্ষা

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (৯/১১) আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলার দিন অনেক মানুষের ফ্লাইট মিস হয়েছিল বা তারা সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারেননি। কেউ জ্যামে ফেঁসেছিলেন, কারো অ্যালার্ম বাজেনি। সেই মুহূর্তে তারা হয়তো অত্যন্ত রাগান্বিত ছিলেন, নিজেকে দুর্ভাগা মনে করছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই তারা বুঝতে পেরেছিলেন, সেই 'মিস হওয়া' বা 'হারানো' সুযোগটিই ছিল তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ।

মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি : আপনি যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারভিউ বা বাস মিস করেন, তখন বিরক্ত না হয়ে বলুন "আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন।"

উম্মে সালামা (রা.)-এর হারানোর শোক

আবু সালামা (রা.) যখন মারা যান, উম্মে সালামা (রা.) নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে একা মানুষ মনে করছিলেন। তাদের ভালোবাসা ছিল প্রবাদতুল্য। রাসূল (সা.) তাকে বললেন, "বলো, হে আল্লাহ এর চেয়ে উত্তম বিনিময় দাও।" উম্মে সালামা মনে মনে ভাবছিলেন, "আবু সালামার চেয়ে উত্তম আর কে হতে পারে?" কিন্তু তিনি আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে দোয়াটি পড়লেন। কিছুদিন পর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তিনি কেবল একজন স্বামী হারালেন, কিন্তু বিনিময়ে হলেন 'উম্মুল মুমিনীন' বা মুমিনদের মা।

মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি : আল্লাহ যখন কোনো বড় দরজা বন্ধ করেন, তখন তিনি তার চেয়েও বড় জানালার দিকে আপনাকে ইশারা করেন।

'নেতিবাচকতা' থেকে 'ইতিবাচকতায়' রূপান্তর

আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলে, মানুষের দুঃখের মূল কারণ Loss Aversion বা হারানোর ভয়। আমরা যা পাই তার চেয়ে যা হারাই তা নিয়ে দ্বিগুণ বেশি চিন্তিত থাকি। কিন্তু মুমিন এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ থেকে মুক্ত থাকে দুটি অস্ত্রের মাধ্যমে:

আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্টি : মুমিন যখন কোনো ক্ষতির শিকার হয়, সে নিজেকে প্রশ্ন করে "আল্লাহ কি আমাকে ভালোবাসেন?" উত্তর যদি হয় "হ্যাঁ", তবে সে বিশ্বাস করে তার ভালোবাসা থেকে আল্লাহ তার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই সন্তুষ্টির অনুভূতি মনের সব ডিপ্রেশন ধুয়ে দেয়।

প্রতিদানের আশা : মুমিন জানে এই হারানোটা চিরস্থায়ী নয়। পরকালে সে যখন তার ধৈর্যের ফল দেখবে, তখন সে বলবে "হায়! দুনিয়ায় যদি আমার আরও অনেক কিছু কেড়ে নেওয়া হতো, তবে আজ আমার সওয়াব আরও বেশি হতো!"

হারানোর ভয়ই যখন জয়

হারানোর সংজ্ঞা যখন আপনি 'বিয়োগ' থেকে 'বিনিময়' হিসেবে দেখবেন, তখন আপনার জীবনে আর কোনো দুঃখ থাকবে না। মুমিনের হারানো কিছু নেই কারণ:

* যা গেছে তা তকদির।

* যা আছে তা নেয়ামত।

* যা আসবে তা আল্লাহর রহমত।

দৃষ্টিভঙ্গির এই আমূল পরিবর্তনই একজন মুমিনকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষে পরিণত করে। পাহাড়সম বিপদ আসলেও সে মুচকি হেসে বলতে পারে "আলহামদুলিল্লাহি আলা কুল্লি হাল" (সব অবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা)।

তকদির বা ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস – প্রশান্তির মূল চাবিকাঠি

মানুষের জীবনের অধিকাংশ দুশ্চিন্তার মূলে থাকে দুটি বিষয়: অতীতের শোক এবং ভবিষ্যতের ভয়। তকদিরে বিশ্বাস এই দুই রোগকেই সমূলে বিনাশ করে দেয়। তকদিরে বিশ্বাস করা মানে হলো এই মহাবিশ্বের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনা যে এক পরম সত্তার নিখুঁত পরিকল্পনার অংশতা অন্তরে গেঁথে নেওয়া।

তকদিরের এক স্বর্গীয় ব্লু-প্রিন্ট

তকদির মানে হলো আল্লাহর পূর্বজ্ঞান। মহাবিশ্ব সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগে আল্লাহ তায়ালা যা কিছু ঘটবে তার সবকিছু লিখে রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"আল্লাহ তায়ালা মাখলুকাত বা সৃষ্টির তকদির আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে লিখে রেখেছেন।" (সহীহ মুসলিম 2653)

দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন :

মুমিন যখন কোনো কিছু হারায়, সে চিন্তা করেএই ঘটনাটি আজ ঘটল না, এটি আসলে কোটি কোটি বছর আগে নির্ধারিত ছিল। যখন বিষয়টি নির্ধারিতই ছিল, তখন তা নিয়ে আফসোস করা বা নিজেকে দোষারোপ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এই ‘অনিবার্যতা’র বোধ মানুষকে অসম্ভব মানসিক স্থিরতা দেয়।

‘যদি’ (If) নামক শয়তানি ফাঁদ থেকে মুক্তি

আমরা যখন কিছু হারাই, তখন আমাদের মনের ভেতর শয়তান একটি শব্দ গেঁথে দেয় ‘যদি’

     "যদি আমি সেদিন সেখানে না যেতাম, তবে এই দুর্ঘটনা ঘটত না।"

     "যদি আমি এই শেয়ারগুলো বিক্রি না করতাম, তবে আজ আমি কোটিপতি থাকতাম।"

     "যদি ডাক্তার সময়মতো আসতেন, তবে মানুষটি মারা যেতেন না।"

এই ‘যদি’ মানুষকে অতীতে বন্দী করে ফেলে এবং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অভিযোগ তৈরি করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন:

"শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম... আর যদি তোমার কোনো বিপদ ঘটে তবে তুমি বলো না যে ‘আমি যদি এমন করতাম তবে এমন হতো’, বরং তুমি বলো ‘আল্লাহ যা ফয়সালা করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তা-ই করেছেন’। কেননা ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের কাজের সুযোগ করে দেয়।" (সহীহ মুসলিম 2664)

তকদিরে বিশ্বাসী মুমিন জানে যে, 'যদি' শব্দটি তার জন্য প্রযোজ্য নয়। যা হওয়ার ছিল তা হয়ে গেছে এবং যা হওয়ার ছিল না তা হওয়ার কোনো উপায় ছিল না।

আল্লাহর হিকমত ও আমাদের সীমাবদ্ধতা

তকদিরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আল্লাহর 'হিকমত' বা প্রজ্ঞায় বিশ্বাস করা। আল্লাহ আমাদের স্রষ্টা, তিনি জানেন কোন সময় আমাদের জন্য কী প্রয়োজন।

উদাহরণ:

একজন সার্জন যখন রোগীর শরীরে অস্ত্রোপচার করেন, তখন তিনি রোগীর রক্ত ঝরান, টিস্যু কেটে ফেলেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি নিষ্ঠুরতা মনে হতে পারে। কিন্তু সার্জন জানেন যে, এই রক্ত ঝরানো এবং ব্যথার মাধ্যমেই রোগীর জীবন বাঁচবে। রোগীও ডাক্তারের ওপর আস্থা রাখেন কারণ তিনি জানেন ডাক্তারের জ্ঞান ও উদ্দেশ্য তার চেয়ে বেশি।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সার্জন। তিনি আমাদের জীবন থেকে কিছু অংশ যখন কেটে বাদ দেন, তখন আমরা কেবল রক্ত এবং ব্যথা দেখি। কিন্তু তিনি এর মাধ্যমে আমাদের আত্মার পচন রোধ করেন এবং দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণের দিকে নিয়ে যান।

তকদির বনাম চেষ্টা: একটি ভারসাম্যপূর্ণ দর্শন তকদিরে বিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে মানুষ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে। ইসলাম আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু চেষ্টার পর ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াটাই হলো আসল ঈমান।

     উটের উদাহরণ: জনৈক সাহাবী রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি উটটি না বেঁধে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করব?" নবীজি (সা.) বললেন, "আগে উটটি বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো।"

     মুমিনের শিক্ষা: আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব চাকরিটি পাওয়ার জন্য। কিন্তু চেষ্টার পরও যদি না পাই, তবে বুঝব তকদিরে এটি নেই এবং এতেই আমার মঙ্গল। অর্থাৎ, চেষ্টা আমার ইবাদত, আর ফলাফল আল্লাহর সিদ্ধান্ত।

 

তকদিরে বিশ্বাসের মনস্তাত্ত্বিক সুফল

তকদিরে বিশ্বাস মানুষকে দুটি চরম অবস্থা থেকে বাঁচায়। সূরা হাদীদ-এর ২৩ নম্বর আয়াতটি মুমিনের জীবনদর্শনের একটি শক্তিশালী স্তম্ভ। এই একটি মাত্র আয়াত মানুষের জীবনের সমস্ত অপ্রাপ্তি, দুঃখ এবং অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করার এক অব্যর্থ ফর্মুলা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

অর্থ: "এটা এজন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা বিমর্ষ না হও এবং তিনি যা তোমাদের দিয়েছেন তার জন্য আনন্দিত (অহংকারী) না হও। আর আল্লাহ কোনো উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।" (সূরা হাদীদ: ২৩)

তকদিরের সাথে সংযোগ

এই আয়াতের ঠিক আগের আয়াতে (আয়াত ২২) আল্লাহ বলেছেন যে, পৃথিবীতে বা তোমাদের নিজেদের ওপর যে বিপদই আসে, তা সংঘটিত হওয়ার আগেই একটি কিতাবে (লাওহে মাহফুজ) লিপিবদ্ধ আছে। আর ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, কেন তিনি আগে থেকে সব লিখে রেখেছেন। এই 'কেন' এর উত্তরই হলো আমাদের জীবনের মানসিক প্রশান্তির চাবিকাঠি।

বিমর্ষ না হওয়া (দুঃখের নিয়ন্ত্রণ)

আয়াতের প্রথম অংশ: "যাতে তোমরা যা হারিয়েছ তাতে বিমর্ষ না হও।"

মানুষ যখন কোনো কিছু হারায় (সম্পদ, প্রিয়জন বা সুযোগ), তখন সে ভেঙে পড়ে কারণ সে মনে করে এটি 'দুর্ঘটনা' বা কারো 'ষড়যন্ত্র'। কিন্তু আল্লাহ বলছেন, এটি আগে থেকেই লেখা ছিল।

  • মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: যখন আপনি জানবেন যে কোনো একটি ক্ষতি আপনার তকদিরে কোটি বছর আগে থেকেই লেখা ছিল, তখন আপনার মন সান্ত্বনা পায়। আপনি ভাবেন, "এটি তো হওয়ারই ছিল, আমি একা চেষ্টা করে এটি রুখতে পারতাম না।" এই উপলব্ধি মানুষকে 'ডিপ্রেশন' থেকে রক্ষা করে।

অতিরিক্ত আনন্দিত বা অহংকারী না হওয়া (সুখের নিয়ন্ত্রণ)

আয়াতের দ্বিতীয় অংশ: "এবং তিনি যা তোমাদের দিয়েছেন তার জন্য (অহংকারে) আনন্দিত না হও।"

এখানে 'আনন্দ' মানে সাধারণ আনন্দ নয়, বরং সেই আনন্দ যা মানুষকে দাম্ভিক করে তোলে। যখন আমরা কিছু পাই, আমরা ভাবি "এটি আমার পরিশ্রমের ফল, আমি অনেক বুদ্ধিমান তাই পেয়েছি।"

  • মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি: মুমিন জানে সে যা পেয়েছে তা তার যোগ্যতায় নয়, বরং আল্লাহর দয়ায়। তকদিরে ছিল বলেই সে পেয়েছে। এই চিন্তা মানুষকে বিনয়ী রাখে। সাফল্য তাকে মাটিতে নামিয়ে আনে, আসমানে চড়ায় না।

দম্ভের পরিণতি

আয়াতের শেষ অংশে আল্লাহ বলছেন যে, তিনি উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। অর্থাৎ, যারা নিজেদের প্রাপ্তিকে নিজেদের কৃতিত্ব মনে করে এবং অন্যদের তুচ্ছ জ্ঞান করে, তারা আল্লাহর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়। তকদিরে বিশ্বাস না থাকলে মানুষ হয় হতাশাবাদী হয়, নয়তো চরম অহংকারী হয়। এই দুই চরম অবস্থার মাঝে তকদির আমাদের ভারসাম্য শেখায়।

বাস্তবমুখী বিশ্লেষণ - ব্যবসায়ে লস ও তকদিরের সান্ত্বনা

আব্দুর রহমান নামক একজন ব্যবসায়ী কঠোর পরিশ্রম করে একটি প্রজেক্টে সব পুঁজি বিনিয়োগ করলেন। কিন্তু আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডে তার সব শেষ হয়ে গেল।

     বস্তুবাদী দৃষ্টি: সে হয়তো আত্মহত্যা করবে অথবা ডিপ্রেশনে চলে যাবে কারণ তার সব পরিশ্রম ব্যর্থ।

     মুমিনের দৃষ্টি: আব্দুর রহমান ভাবলেন, "আল্লাহ আমার তকদিরে যতটুকু রিজিক লিখেছেন তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। হয়তো এই সম্পদ থাকলে আমি যাকাত দিতাম না বা গুনাহে লিপ্ত হতাম।

“ আল্লাহ আমাকে পবিত্র করতে চান।”

এই বিশ্বাস তাকে নতুন করে কাজ শুরু করার শক্তি দেয়। সে হারালো সম্পদ, কিন্তু পেল ‘সবর’ বা ধৈর্যের মতো একটি মহামূল্যবান আধ্যাত্মিক সম্পদ।

মুমিনের কাছে হারানো মানে হলো কেবল একটি বস্তুর স্থানান্তর। তকদিরে বিশ্বাসের মাধ্যমে সে বোঝে যে, মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণ কোনো অন্ধ শক্তির হাতে নয়, বরং এক পরম দয়াময় আল্লাহর হাতে। তাই তার জীবনে কোনো বিয়োগান্তক পরিণতি আসলে সে তাতে আল্লাহর রহমত খুঁজে পায়।

 

সবর ও শোকর – মুমিনের দুই ডানা

ইসলামি আধ্যাত্মিকতায় মুমিনের জীবনকে একটি পাখির সাথে তুলনা করা হয়েছে। একটি পাখি যেমন দুই ডানা ছাড়া উড়তে পারে না, তেমনি একজন মুমিনও 'সবর' এবং 'শোকর' ছাড়া জান্নাতের পথে উড়াল দিতে পারে না। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তার বিখ্যাত 'উদ্দাতুস সাবেরিন' কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, ঈমানের অর্ধেক হলো সবর এবং বাকি অর্ধেক হলো শোকর।

সবর (ধৈর্য): কেবল সহ্য করা নয়, বরং জয় করা

সাধারণত আমরা মনে করি সবর মানে হলো কোনো বিপদে পড়ে চুপচাপ থাকা বা নিরুপায় হয়ে সহ্য করা। কিন্তু ইসলামের পরিভাষায় সবরের অর্থ অনেক বেশি ব্যাপক এবং ইতিবাচক।

সবরের তিনটি স্তর

১. ইবাদত পালনে সবর : এটি হলো আল্লাহর নির্দেশ পালনে অবিচল থাকা। কনকনে শীতে ফজর নামাজে ওঠা, ক্ষুধার্ত অবস্থায় রোজা রাখাএসবই সবরের অংশ। এখানে সবর মানে হলো নিজের নফস বা প্রবৃত্তিকে শাসন করা।

প্রয়োগ: জীবনে যখন অলসতা আসবে, তখন সবরের ডানা ব্যবহার করে নিজেকে সিজদায় নিয়ে যাওয়া।

২. গুনাহ থেকে বাঁচতে সবর : বর্তমান ফিতনার যুগে এটি সবচেয়ে কঠিন। চোখের সামনে গুনাহের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ভয়ে নিজেকে থামিয়ে রাখা হলো সবর।

প্রয়োগ: সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো অশ্লীল কিছু সামনে এলে 'স্ক্রল' করে চলে যাওয়া এবং নিজের দৃষ্টিকে সংযত রাখা এক মহান সবর।

 

৩. বিপদ-আপদ ও হারানোতে সবর: প্রিয়জনের মৃত্যু, অসুস্থতা বা আর্থিক ক্ষতিতে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। রাসূল (সা.) বলেছেন, "প্রকৃত সবর হলো বিপদের প্রথম আঘাতেই নিজেকে সামলে নেওয়া।"

সবরের মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি

সবর মানুষকে 'ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স' বা আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা দান করে। যখন কেউ আপনাকে গালি দেয় বা আপনার ক্ষতি করে, তখন তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া  না করে সবর করা আপনাকে আধ্যাত্মিক উচ্চতায় নিয়ে যায়।

"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা বাকারা: ১৫৩)

চিন্তা করুন, যার সাথে মহাবিশ্বের অধিপতি স্বয়ং আছেন, সে কি কখনো কিছু 'হারানো'র বেদনা অনুভব করতে পারে? আল্লাহর সান্নিধ্যই তার সব বড় ক্ষতির ক্ষতিপূরণ।

শোকর (কৃতজ্ঞতা): মনের প্রশান্তির রসদ

শোকর হলো নেয়ামতকে স্বীকার করা এবং দাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন অন্তত তিনটি কৃতজ্ঞতার বিষয় লেখে, তাদের সুখের মাত্রা অন্যদের চেয়ে ২৫% বেশি। ইসলাম এই থিওরি ১৪০০ বছর আগেই দিয়েছে।

শোকরের তিনটি স্তম্ভ

1. অন্তরের শোকর: মনে মনে বিশ্বাস করা যে, আমার যা কিছু আছে সব আল্লাহর দান। এটি অহংকার মুক্তি দেয়।

২. মুখের শোকর: কথায় কথায় 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা। এটি কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি স্বীকৃতি।

৩. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের শোকর: আল্লাহ আপনাকে যে নেয়ামত দিয়েছেন, তা তার অবাধ্যতায় ব্যবহার না করা। চোখের শোকর হলো তা দিয়ে পবিত্র কিছু দেখা, হাতের শোকর হলো তা দিয়ে মানুষের উপকার করা।

সূরা ইব্রাহীমের ৭ নম্বর আয়াতটি মুমিনের জীবনের 'উন্নতি ও প্রাচুর্যের মহা-সূত্র'এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কৃতজ্ঞতা (শোকর) এবং অকৃতজ্ঞতা (কুফর)-এর পরিণাম অত্যন্ত জোরালোভাবে ব্যক্ত করেছেন। আয়াতটি হলো:

অর্থ: "এবং যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে (নেয়ামত) বাড়িয়ে দেব; আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর।" (সূরা ইব্রাহীম: ৭)

এই আয়াতটি হযরত মূসা (আ.) তাঁর কওম বনী ইসরাঈলকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন।

ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, কৃতজ্ঞতা কেবল মুখ দিয়ে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা নয়। শোকর হলো তিনটি জিনিসের সংমিশ্রণ:

  • অন্তরে স্বীকার করা: বিশ্বাস করা যে এই নেয়ামত কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে, আমার ব্যক্তিগত যোগ্যতায় নয়।
  • মুখে উচ্চারণ করা: আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনা করা।
  • কাজে প্রমাণ করা: আল্লাহ যে নেয়ামত দিয়েছেন তা তাঁর অবাধ্যতায় ব্যয় না করা।

ইবনে কাসীর উল্লেখ করেন, "শোকর হলো বিদ্যমান নেয়ামতের জিঞ্জির (শিকল) এবং হারিয়ে যাওয়া নেয়ামতের শিকারী।" অর্থাৎ, আপনি যদি চান আপনার বর্তমান সুখ স্থায়ী হোক, তবে শোকর করুন। আর যদি চান আরও সুখ আসুক, তবে শোকর করুন।

অকৃতজ্ঞতার ভয়াবহতা: 'নিশ্চয়ই আমার শাস্তি কঠোর'

আয়াতের শেষ অংশটি একটি হুশিয়ারি। আল্লাহ এখানে 'আমি নেয়ামত কমিয়ে দেব' বলেননি, বরং বলেছেন 'আমার শাস্তি কঠোর'

  • ইমাম কুরতুবীর ব্যাখ্যা: অকৃতজ্ঞতার বড় শাস্তি হলো আল্লাহ সেই বান্দার থেকে শোকর করার তাওফিক কেড়ে নেন। ফলে সে হাজারো নেয়ামতের মাঝে থেকেও সবসময় অতৃপ্ত এবং অশান্তিতে ভোগে।
  • নেয়ামত কেড়ে নেওয়া: কখনো কখনো অকৃতজ্ঞতার কারণে নেয়ামত কেড়ে নেওয়া হয়, যেমনটি হয়েছিল সাবার অধিবাসীদের ক্ষেত্রে। তাদের বিশাল বাগান ও প্রাচুর্য ছিল, কিন্তু অকৃতজ্ঞতার কারণে আল্লাহ বন্যায় সব ধুয়ে নিয়েছিলেন।

মুমিনের 'হারানো কিছু নাই' । হারানো নয়, বরং পুনঃবিনিয়োগ: মুমিন যখন কিছু হারায়, সে কান্নাকাটি না করে যা অবশিষ্ট আছে তার শোকর করে। সূরা ইব্রাহীমের এই ফর্মুলা অনুযায়ী, যখন সে অবশিষ্ট নেয়ামতের শোকর করে, আল্লাহ তার সেই 'হারানো' গর্তটি নতুন নেয়ামত দিয়ে পূরণ করে দেন।

মনস্তাত্ত্বিক প্রশান্তিমানুষ যখন যা নেই তা নিয়ে চিন্তা করে, সে বিষণ্ণ হয়। আর যখন যা আছে (সুস্থ চোখ, শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা, পরিবার) তা নিয়ে শোকর করে, তখন তার মস্তিষ্ক আনন্দিত হয়। এই আয়াতের বিশ্বাস মানুষকে নেতিবাচকতা থেকে বের করে আনে।

বরকতের চাবিকাঠিমুমিন জানে তার ১০০০ টাকা যদি শোকরের সাথে ব্যয় হয়, তবে তা অকৃতজ্ঞ ব্যক্তির ১ লক্ষ টাকার চেয়ে বেশি কাজ দেবে। কারণ আল্লাহর ওয়াদাশোকর করলে তিনি বাড়িয়ে দেবেন। এই 'বৃদ্ধি' হলো অদৃশ্য বরকত।

সূরা ইব্রাহীমের ৭ নম্বর আয়াত আমাদের শেখায় যে, নেয়ামত ধরে রাখার উপায় হলো কৃতজ্ঞতা। মুমিনের হারানো কিছু নেই কারণ সে যদি সামান্য কিছু হারিয়েও ফেলে, তার শোকরের কারণে আল্লাহ তাকে আরও বড় ও উত্তম কিছুর দিকে এগিয়ে নিয়ে যান।

দৈনন্দিন জীবনে সবর ও শোকরের প্রয়োগ

'হারানো'র মুহূর্তে সবরের প্রয়োগ:

যখনই কোনো আর্থিক ক্ষতি হবে বা প্রিয় কোনো সুযোগ হাতছাড়া হবে, সাথে সাথে এই বাক্যটি বলুন: "হে আল্লাহ! আমি আপনার ফয়সালায় সন্তুষ্ট।"

টিপস: মনে রাখবেন, আপনার কান্না বা চিৎকার আপনার হারানো জিনিসটি ফিরিয়ে আনবে না, কিন্তু আপনার সবর আপনার জন্য জান্নাতে একটি ঘর  নির্মাণ করবে।

সম্পর্কের টানাপোড়েনে সবর:

স্বামী-স্ত্রী বা বন্ধু-বান্ধবের সাথে মনোমালিন্য হলে সবরের আশ্রয় নিন। অপরপক্ষের ভুলগুলো ক্ষমা করে দেওয়া সবরের সর্বোচ্চ স্তর (এহসান)। এটি সম্পর্ককে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে।

সকাল-সন্ধ্যার শোক:

প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে অন্তত 3টি এমন বিষয় চিন্তা করুন যা আজ আপনার ভালো হয়েছে। হতে পারে সেটি একটি সুস্বাদু খাবার, কারো হাসি মুখ, কিংবা নিরাপদে ঘরে ফেরা।

মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি: আপনি যদি আজ সুস্থভাবে শ্বাস নিতে পারেন, তবে আপনি পৃথিবীর কয়েক কোটি মুমূর্ষু রোগীর চেয়ে বেশি সম্পদশালী। এই শোকর আপনার ডিপ্রেশন কমিয়ে দেবে।

আইয়ুব (আ.)-এর সবর ও সুলাইমান (আ.)-এর শোকর

আইয়ুব (আ.): তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর কঠিন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। সম্পদ হারিয়েছেন, সন্তান হারিয়েছেন, সমাজচ্যুত হয়েছেন। কিন্তু তার জবান থেকে কখনো অভিযোগ বের হয়নি। তিনি ছিলেন সবরের পাহাড়। ফলাফল? আল্লাহ তাকে সব ফিরিয়ে দিলেন এবং তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিলেন।

শিক্ষা: সবর কখনো বৃথা যায় না।

সুলাইমান (আ.): তিনি ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতাপশালী রাজা। পশু-পাখি ও জিনেরা তার হুকুম মানত। এত সম্পদ ও ক্ষমতার মাঝেও তিনি প্রতিটি মুহূর্তে বলতেন, "হাজা মিন ফাদলি রাব্বি" (এটি আমার রবের অনুগ্রহ)।

শিক্ষা: প্রাপ্তি যেন আপনাকে আল্লাহর থেকে দূরে না সরায়।

 

শোকর বনাম অভিযোগের মানসিকতা

আমরা অভিযোগ করতে ভালোবাসি। "গরম অনেক বেশি," "রাস্তায় অনেক জ্যাম," "জিনিসপত্রের অনেক দাম।" এই অভিযোগের সংস্কৃতি আমাদের ভেতরে এক ধরনের 'মানসিক বিষাদ' তৈরি করে।

মুমিন এই জ্যামের মধ্যেও চিন্তা করে "আলহামদুলিল্লাহ, আমার অন্তত একটি গাড়ি বা বাইক আছে, বা আমি অন্তত হেঁটে যাওয়ার মতো সুস্থ আছি।"

যখন আপনি আপনার অভিযোগগুলোকে কৃতজ্ঞতায়  রূপান্তর করবেন, তখন আপনার হারানো বলে কিছু থাকবে না। আপনি তখন প্রতিটি মুহূর্তকে একটি উপহার হিসেবে দেখবেন।

সবর এবং শোকর কেবল দুটি শব্দ নয়, এটি একটি জীবনপদ্ধতি। সবর আপনাকে বিপদে ভাঙতে দেয় না, আর শোকর আপনাকে সুখে ভাসতে দেয় না। এই দুই ডানার সমন্বয়েই মুমিন পৃথিবীর বুকে জান্নাতি প্রশান্তি নিয়ে বিচরণ করে। মুমিনের ডিকশনারিতে হারানো নেই, কারণ সবরের বিনিময়ে সে পায় আল্লাহর সঙ্গ, আর শোকরের বিনিময়ে সে পায় নেয়ামতের বৃদ্ধি।

দুনিয়া একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র –    

 

মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হলো এই উপলব্ধি যেএই পৃথিবী আমাদের আসল ঘর নয়, বরং এটি একটি 'পরীক্ষাকেন্দ্র'। আমরা যখন কোনো পরীক্ষার হলে বসি, তখন সেখানে আমাদের আরাম-আয়েশ প্রত্যাশা করি না। আমরা জানি সেখানে প্রশ্নপত্র কঠিন হতে পারে, কলমের কালি ফুরিয়ে যেতে পারে, কিংবা সময় কম হতে পারে। কিন্তু একজন ছাত্র কেন সেই কষ্ট সহ্য করে? কারণ সে জানে, এই তিন ঘণ্টার কষ্ট তাকে সারাজীবনের একটি উজ্জ্বল ক্যারিয়ার উপহার দেবে।

মুমিনের কাছে দুনিয়া ঠিক তেমনই একটি তিন ঘণ্টার পরীক্ষার হল।

পরীক্ষার ঘোষণা: কুরআন কী বলে?

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি আমাদের পরীক্ষা করবেন। এটি কোনো লুকোছাপা বিষয় নয়। তিনি বলেন:

"যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন যে, তোমাদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে কে সবচেয়ে উত্তম?" (সূরা মুলক: ২)

এখানে লক্ষণীয় যে, আল্লাহ বলেননি তিনি আমাদের পরীক্ষা করবেন কে সবচেয়ে বেশি 'সম্পদশালী' বা 'ক্ষমতাধর'। তিনি পরীক্ষা করবেন কার 'আমল' বা আচরণ সবচেয়ে সুন্দর। হারানো এবং পাওয়ার মাঝে আমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হয়, সেটাই হলো এই পরীক্ষার মূল বিষয়বস্তু।

পরীক্ষার বৈচিত্র্য: ভয়, ক্ষুধা ও সম্পদহানি

আল্লাহ পরীক্ষার সিলেবাসও আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন:

"আমি অবশ্যই তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব; আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদের।" (সূরা বাকারা: ১৫৫)

এই আয়াতটি গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আল্লাহ পাঁচটি বিষয়ের কথা বলেছেন:

 

1.   ভয় : শত্রুভয়, ভবিষ্যতের ভয় বা অজানা আতঙ্ক।

2.   ক্ষুধা : দারিদ্র্য বা অনাহার।

3.   সম্পদহানি : ব্যবসায়িক লোকসান বা সম্পদ চুরি হওয়া।

4.   জীবনহানি : প্রিয়জনের মৃত্যু বা নিজের অসুস্থতা।

5.   ফসলের ক্ষতি : মেহনতের ফল না পাওয়া বা ক্যারিয়ারে ব্যর্থতা।

 

মুমিন যখন এই আয়াতটি পড়ে, তখন সে মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যায়। সে জানে যে তার জীবনে এই পাঁচটি ঘটনা ঘটবেই। যখন ঘটে, তখন সে অবাক হয় না, বরং বলে "ওহ! আমার পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে তো এই প্রশ্নটি থাকার কথা ছিলই।" এই প্রস্তুতিই তাকে মানসিক প্রশান্তি দেয়।

পরীক্ষার ধরণ: কেবল কষ্ট নয়, সুখও একটি পরীক্ষা

আমরা মনে করি কেবল দুঃখই পরীক্ষা। কিন্তু ইসলামি দর্শনে 'সুখ' বা 'প্রাপ্তি' হলো আরও কঠিন পরীক্ষা।

     দুঃখের পরীক্ষা: এটি মানুষকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়। মানুষ বিপদে পড়লে সাধারণত "ইয়া আল্লাহ" বলে ডাক দেয়।

     সুখের পরীক্ষা: এটি মানুষকে অহংকারী ও উদাসীন করে তোলে। সম্পদ, ক্ষমতা এবং সৌন্দর্য পেলে মানুষ ভুলে যায় যে এগুলো কেড়ে নেওয়া হতে পারে।

সুলাইমান (আ.) যখন তার সামনে বিলকিসের সিংহাসন উপস্থিত দেখলেন, তিনি সাথে সাথে বললেন: "এটি আমার রবের পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা, তিনি দেখতে চান আমি কৃতজ্ঞ হই নাকি অকৃতজ্ঞ হই।"

 

কেন আল্লাহ পরীক্ষা নেন?

নাস্তিক বা সংশয়বাদীরা প্রশ্ন করতে পারে আল্লাহ তো সব জানেনই, তবে পরীক্ষা নেওয়ার দরকার কী? এর উত্তর গভীর:

সত্যবাদিতা ও ভণ্ডামির পার্থক্য:

একটি স্বর্ণের টুকরো আসল নাকি নকল তা বোঝার জন্য সেটিকে আগুনে পোড়াতে হয়। তেমনি কে মুখে ঈমানের দাবি করে আর কার অন্তরে ঈমান আছে, তা প্রমাণের জন্য আগুনের মতো কঠিন পরীক্ষার প্রয়োজন।

আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ ও উন্নতি:

একজন অ্যাথলেট যখন অলিম্পিকে যায়, তাকে কঠোর ট্রেইনিং করতে হয়। মাংসপেশিতে ব্যথা না হলে সে শক্তিশালী হয় না। তেমনি মুমিনের আত্মার শক্তি বৃদ্ধির জন্য দুঃখের 'ব্যায়াম' প্রয়োজন। হারানোর বেদনা মুমিনকে দুনিয়াবি মায়া থেকে মুক্ত করে আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে।

জান্নাতের উচ্চ মাকাম:

কারো আমলনামায় হয়তো জান্নাতের উচ্চ স্তরে যাওয়ার মতো যথেষ্ট ইবাদত নেই। আল্লাহ তাকে কিছু বিপদে ফেলে সবর করার সুযোগ দেন, যাতে সেই সবরের বিনিময়ে তিনি তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারেন।

 

 

বিপদের মাঝে লুকিয়ে থাকা রহমত

দুনিয়া পরীক্ষার ক্ষেত্র বলেই এখানে বিচ্ছেদ আছে। কিন্তু মুমিনের জন্য প্রতিটি বিচ্ছেদ হলো জান্নাতে পুনর্মিলনের একটি সেতু।

একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক উদাহরণ:

আপনি যদি একটি বড় পাহাড় জয় করতে চান, তবে আপনাকে খাড়া ঢাল বেয়ে উঠতে হবে। আপনার পা ব্যথা করবে, আপনার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে। কিন্তু প্রতিটি কষ্টকর পদক্ষেপ আপনাকে চূড়ার আরও কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। মুমিনের জীবনে প্রতিটি 'হারানো' বা 'ব্যর্থতা' হলো সেই পাহাড়ের খাড়া ঢাল। কষ্টের তীব্রতা যত বেশি, বিজয়ের আনন্দ তত মধুর।

পরীক্ষার খাতায় মুমিনের উত্তরপত্র

পরীক্ষার হলে যেমন সেরা ছাত্রটি শান্ত থাকে, তেমনি দুনিয়ার পরীক্ষায় মুমিনের উত্তরপত্র তৈরি হয় তিনটি কলম দিয়ে:

1.   সবর : পরিস্থিতির কাছে মাথা নত না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।

2.   সন্তোষ : আল্লাহর ফয়সালাকে ভালোবেসে মেনে নেওয়া।

3.   প্রার্থনা : পরীক্ষার হল থেকে সাহায্য চাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো দোয়া।

পরীক্ষার সমাপ্তি যেখানে

দুনিয়া যেহেতু পরীক্ষার ক্ষেত্র, তাই এখানে স্থায়ী সুখ বা স্থায়ী দুঃখকোনোটিই নেই। পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে খাতা কেড়ে নেওয়া হবে। মৃত্যুর ফেরেশতা আসা মানেই পরীক্ষার সময় শেষ হওয়া।

মুমিন জানে, সে যদি এই সংক্ষিপ্ত সময়ে তার ধৈর্য ও ঈমান রক্ষা করতে পারে, তবে পুরস্কার হিসেবে সে এমন এক জগত (জান্নাত) পাবে যেখানে কোনো পরীক্ষা নেই, কোনো হারানো নেই, কোনো বিচ্ছেদ নেই।

 

নবীগণের পরীক্ষা: মহোত্তমদের কঠিনতম সংগ্রাম

 

আল্লাহ তায়ালা কেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের সবচেয়ে বেশি কষ্টে ফেললেন? কারণ, তাঁদের জীবন আমাদের জন্য একেকটি 'মডেল' বা আদর্শ। আমরা যখন কোনো কষ্টে পড়ি, তখন এই নবীগণের জীবনের দিকে তাকালে আমাদের নিজেদের কষ্টকে খুব নগণ্য মনে হয়।

ইব্রাহীম (আ.): ভালোবাসার কঠিনতম পরীক্ষা

হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে বলা হয় 'খলিলুল্লাহ' বা আল্লাহর বন্ধু। তাঁর পরীক্ষাগুলো ছিল কল্পনাতীত:

     পরিবার হারানো: নিজের পিতাকে দাওয়াত দিতে গিয়ে তিনি ঘরছাড়া হলেন।

     নিরাপত্তা হারানো: সত্য প্রচারের জন্য তাঁকে জীবন্ত আগুনের কুণ্ডলীতে নিক্ষেপ করা হলো।

     সন্তান ও স্ত্রী বিচ্ছেদ: দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর পাওয়া সন্তান ইসমাইল (আ.) এবং স্ত্রী হাজেরা (আ.)-কে জনমানবহীন মরুভূমিতে রেখে আসার নির্দেশ দেওয়া হলো।

     চূড়ান্ত পরীক্ষা (কোরবানি): যখন সন্তান বড় হলো, তখন তাঁকে নিজ হাতে জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হলো।

মুমিনের শিক্ষা: ইব্রাহীম (আ.) দেখিয়ে দিলেন, যদি আল্লাহকে পাওয়া যায়, তবে পৃথিবীর সব হারানোই তুচ্ছ। তিনি যখন আগুনে পড়লেন, তখন তাঁর হারানোর কিছু ছিল না কারণ তাঁর সাথে আল্লাহ ছিলেন। আগুনের শিখা তাঁর জন্য ফুলের বাগান হয়ে গেল।

ইউসুফ (আ.): ষড়যন্ত্র ও একাকিত্বের পরীক্ষা

ইউসুফ (আ.)-এর জীবন যেন একের পর এক হারানোর মিছিল। কিন্তু প্রতিটি হারানো তাঁকে একটি বড় প্রাপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল:

     ভাইদের ভালোবাসা হারানো: ভাইদের হিংসার শিকার হয়ে কূপে নিক্ষিপ্ত হলেন।

     স্বাধীনতা হারানো: কূপ থেকে উদ্ধার হয়ে তিনি মিশরের বাজারে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হলেন।

     চরিত্রের অপবাদ ও কারাবাস: জুলাইখার ষড়যন্ত্রে তিনি দীর্ঘ সময় জেলখানায় কাটালেন।

মুমিনের শিক্ষা: ইউসুফ (আ.) যদি কূপে না পড়তেন, তবে তিনি মিশরে পৌঁছাতে পারতেন না। যদি জেলে না যেতেন, তবে বাদশাহর স্বপ্ন ব্যাখ্যা করে মিশরের অধিপতি হতে পারতেন না। আপনার আজকের 'হারানো' বা 'বিপদ' হয়তো আপনাকে ভবিষ্যতের কোনো রাজকীয় মাকামে পৌঁছানোর সিঁড়ি মাত্র।

আইয়ুব (আ.): ধৈর্য ও শারীরিক যন্ত্রণার পরীক্ষা

মুমিন যখন অসুস্থ হয় বা সম্পদ হারায়, তখন তার জন্য আইয়ুব (আ.)-এর জীবনের চেয়ে বড় কোনো সান্ত্বনা নেই।

     তিনি ছিলেন বিশাল ধন-সম্পদ ও অনেক সন্তানের পিতা। একদিনের ব্যবধানে তাঁর সব সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেল এবং সব সন্তান মৃত্যুবরণ করলেন।

     এরপর তিনি এমন এক চর্মরোগে আক্রান্ত হলেন যে, তাঁর শরীর থেকে মাংস খসে পড়ত। দীর্ঘ ১৮ বছর তিনি এই অবস্থায় ছিলেন। তাঁর জিহ্বা ও অন্তর ছাড়া শরীরের কোনো অংশ সুস্থ ছিল না।

মুমিনের শিক্ষা: আইয়ুব (আ.) একবারও আল্লাহর প্রতি অভিযোগ করেননি। তিনি বলতেন, "আল্লাহ আমাকে ৮০ বছর সুস্থ রেখেছেন, এখন না হয় কয়েক বছর অসুস্থ থাকলাম।" আল্লাহ তাঁর এই সবর দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে সব আগের চেয়ে বেশি ফিরিয়ে দিলেন

নূহ (আ.) ও লূত (আ.): আপনজন হারানোর বেদনা

অনেক সময় আমরা মুমিন হওয়া সত্ত্বেও আমাদের পরিবারের সদস্যরা বিপথগামী থাকে। এটি একটি বিশাল মানসিক পরীক্ষা।

     নূহ (আ.) ৯৫০ বছর দাওয়াত দিলেন, কিন্তু তাঁর নিজের সন্তান ও স্ত্রী তাঁর ওপর বিশ্বাস আনল না। তাঁর চোখের সামনেই তাঁর সন্তান বন্যায় ডুবে মারা গেল।

     লূত (আ.)-এর স্ত্রী কাফেরদের পক্ষ নিয়ে ধ্বংস হয়ে গেল।

মুমিনের শিক্ষা: হে মুমিন! যদি তোমার আপনজন তোমার কথা না শোনে বা তোমাকে ছেড়ে চলে যায়, তবে নূহ (আ.) ও লূত (আ.)-এর দিকে তাকাও। হেদায়েতের মালিক আল্লাহ। তুমি কেবল ধৈর্য ধরো, তোমার দায়িত্ব তুমি পালন করেছ।

 

মুহাম্মদ (সা.): সর্বকালের সেরা ধৈর্যশীল

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ছিল পরীক্ষার এক মহাকাব্য:

     জন্মের আগেই বাবা হারানো, শৈশবে মা হারানো: তিনি ছিলেন এতিম।

     সন্তান বিচ্ছেদ: তাঁর সাত সন্তানের মধ্যে ছয়জনই তাঁর জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেন। কল্পনা করুন একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় হারানো আর কী হতে পারে?

     দেশ ও সমাজ হারানো: প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে তাঁকে হিজরত করতে হলো।

     দারিদ্র্য: মাসের পর মাস তাঁর ঘরে চুলা জ্বলত না। পেটে পাথর বেঁধে তিনি যুদ্ধ করেছেন।

মুমিনের শিক্ষা: সৃষ্টির সেরা মানব হওয়া সত্ত্বেও তিনি দুনিয়াবি সব হারানোর মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। তিনি যদি সব কষ্ট সয়ে হাসিমুখে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলতে পারেন, তবে আমরা কেন পারব না?

 

কেন এই পরীক্ষাগুলো প্রয়োজন ছিল?

নবীগণের এই কাহিনীগুলো কেবল গল্প নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে:

1.   বিপদ আল্লাহর অসন্তুষ্টির লক্ষণ নয়: যদি বিপদ মানেই আল্লাহর রাগ হতো, তবে নবীগণ সবচেয়ে বেশি সুখে থাকতেন। উল্টো তাঁরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছেন। সুতরাং বিপদ হলো 'আল্লাহর ভালোবাসা'র একটি ধরন।

2.   উচ্চ মর্যাদা প্রাপ্তি: জান্নাতে এমন কিছু মাকাম আছে যা কেবল ইবাদত দিয়ে পাওয়া যায় না, বরং কঠিন বিপদে সবর করার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।

3.   মানবজাতির জন্য সান্ত্বনা: আল্লাহ জানতেন কিয়ামত পর্যন্ত মানুষ হারানো বেদনায় পুড়বে। তাই তিনি নবীগণকে দিয়ে সেই কষ্টের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা সান্ত্বনা পাই।

পরীক্ষার শেষে সুসংবাদ

পরীক্ষা যেহেতু আছে, তাই ফলাফলও আছে। আল্লাহ একটি জাদুকরী বাক্য :

  অর্থাৎ, "আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদের।" (আল-বাকারা আয়াত: ১৫৫)

মুমিন যখন পরীক্ষায় পাস করে, তখন সে কেবল সেই জিনিসটিই ফিরে পায় না যা সে হারিয়েছিল, বরং সে পায় স্বয়ং আল্লাহকে। আর যে আল্লাহকে পেয়েছে, তার তো হারানো বলতে আসলে কিছুই নেই।

সালাফদের সবর: যখন ঈমান পাহাড়ের চেয়েও অটল

সালাফদের জীবন দর্শন ছিল"বিপদ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা গোপন চিঠি।" তাঁরা বিপদে ঘাবড়ে যেতেন না, বরং চিঠির খাম খুলে দেখতেন ভেতরে আল্লাহর কী পুরস্কার লুকিয়ে আছে।

 

 

উরওয়া ইবনুল জুবায়ের (রহ.): এক রাতে দুই বিশাল ক্ষতি

তাবেঈদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ছিলেন উরওয়া ইবনুল জুবায়ের। একবার তাঁর পায়ে একটি কঠিন রোগ (গ্যাংগ্রিন) হলো। চিকিৎসকরা জানালেন, জীবন বাঁচাতে হলে পা কেটে ফেলতে হবে। তখনকার দিনে অ্যানেস্থেশিয়া ছিল না। তিনি বললেন, "আমি যখন নামাজে দাঁড়াব, তখন আমার পা কাটবেন, কারণ তখন আমি আল্লাহর প্রেমে বিভোর থাকি।"

যখন তাঁর পা কাটা হচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে খবর এলতাঁর প্রিয় পুত্র ঘোড়ার লাথিতে মারা গেছে। এক রাতে তিনি নিজের পা হারালেন এবং প্রিয় সন্তানকে হারালেন। কিন্তু তাঁর প্রতিক্রিয়া কী ছিল? তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন:

"হে আল্লাহ! আমার চারটে হাত-পা ছিল, আপনি একটা নিয়েছেন, কিন্তু তিনটে তো এখনো অক্ষত রেখেছেন! আমার সাতজন সন্তান ছিল, আপনি একজনকে নিয়েছেন, কিন্তু ছয়জন তো এখনো আমার কাছে আছে! আপনি যা দিয়েছেন তার জন্য শোকর, আর যা নিয়েছেন তার জন্য সবর।"

শিক্ষা: আমাদের যা নেই তা নিয়ে আফসোস না করে যা এখনো আমাদের কাছে আছে তার দিকে তাকালে হারানোর বেদনা কর্পূরের মতো উড়ে যায়।

জনৈক পুণ্যবতী নারী ও তাঁর দুই পুত্র

সালাফদের যুগে এক পুণ্যবতী নারী ছিলেন। একদিন তাঁর দুই পুত্র একসাথে মারা গেল। তিনি ঘরে ফিরে ছেলেদের লাশ ঢেকে রাখলেন। তাঁর স্বামী ঘরে ফিরে সন্তানদের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে বললেন, "তারা ভালো আছে।" এরপর তিনি স্বামীকে খাবার দিলেন। খাওয়া শেষ হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন:

"হে আমার স্বামী! কেউ যদি আপনাকে কোনো আমানত দেয় এবং পরে তা ফেরত চায়, তবে কি আপনার খারাপ লাগবে?"

স্বামী বললেন, "না, আমানত তো ফেরত দিতেই হয়।"

তখন নারীটি বললেন, "তবে জেনে রাখুন, আল্লাহ তাঁর আমানত (আমাদের দুই সন্তান) নিয়ে গেছেন।"

শিক্ষা: এই নারীটি জানতেন যে সন্তানরা আল্লাহর আমানত। মালিক তাঁর আমানত ফেরত নিয়েছেনএই বোধই তাঁকে পাহাড়সম ধৈর্য দিয়েছিল।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.): আদর্শের জন্য শারীরিক নির্যাতন

খলিফা মুতাসিমের আমলে 'কুরআন মাখলুক' বা সৃষ্ট কি নাএই আকিদাগত প্রশ্নে ইমাম আহমদকে প্রচণ্ড নির্যাতন করা হয়। তাঁকে টানা ত্রিশ মাস কারারুদ্ধ রাখা হয় এবং প্রতিদিন চাবুক মারা হতো। চাবুকের আঘাতে তাঁর শরীর রক্তাক্ত হয়ে যেত, তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়তেন। তাঁকে বলা হয়েছিল সামান্য একটি মিথ্যে কথা বলতে, তাহলেই মুক্তি পাবেন। কিন্তু তিনি সত্যের জন্য সব কষ্ট সহ্য করলেন।

তিনি বলতেন, "আমার চাবুকের আঘাত তো পিঠে লাগছে, কিন্তু আমার ঈমান তো অক্ষত আছে।"

শিক্ষা: শরীরের কষ্ট বা সম্পদের ক্ষতি বড় ক্ষতি নয়; আসল ক্ষতি হলো ঈমান হারিয়ে ফেলা। যদি ঈমান ঠিক থাকে, তবে দুনিয়াবি কোনো নির্যাতনই মুমিনকে হারাতে পারে না।

ইব্রাহিম ইবনে আদহাম (রহ.): রাজপ্রাসাদ ত্যাগের বীরত্ব

তিনি ছিলেন বলখের বাদশাহ। সব ধরনের ভোগ-বিলাস তাঁর হাতের মুঠোয় ছিল। কিন্তু একদিন আল্লাহর প্রেমের টানে তিনি রাজপ্রাসাদ, ক্ষমতা, সম্পদসব ছেড়ে দিলেন। মানুষ তাকে পাগল মনে করত যে এমন বিশাল সাম্রাজ্য কেউ 'হারায়' বা ছেড়ে দেয়? তিনি বলতেন:

"আমরা যদি জানতাম এই ত্যাগের ভেতরে কী সুখ আছে, তবে দুনিয়ার রাজারা আমাদের থেকে সেই সুখ কেড়ে নেওয়ার জন্য তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধে আসত।"

শিক্ষা: কখনো কখনো আল্লাহর জন্য কোনো কিছু 'হারানো' বা ত্যাগ করা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাজত্ব পাওয়ার সমান।

 

দুনিয়া একটি সরাইখানা:

ইমাম হাসান বসরী (রহ.) বলতেন, "মানুষের জীবন হলো একটি মেঘের ছায়ার মতো। একটু পর সেই ছায়া থাকবে না।" যখন ছায়া চলে যায়, তখন কেউ কান্নাকাটি করে না। সালাফরা দুনিয়াকে এতটাই তুচ্ছ মনে করতেন যে, কোনো কিছু হারিয়ে গেলে তাঁরা মনে করতেন পিঠের ওপর থেকে একটি বাড়তি বোঝা নেমে গেল।

মুমিনের হারানো কিছু নেই কারণ সে যা হারায় তার বিনিময়ে সে এমন কিছু পায় যা পৃথিবীর সব হীরা-জহরত দিয়েও কেনা সম্ভব নয়আর তা হলো "আল্লাহর সন্তুষ্টি"।

আখিরাতে হারানো জিনিসের বিনিময় – শূন্যতার পূর্ণতা যেখানে

একজন মুমিন যখন দুনিয়াতে কোনো কিছু হারায়সেটি হোক সম্পদ, প্রিয়জন, স্বাস্থ্য কিংবা কোনো স্বপ্নতার অবচেতন মনে একটি ধ্রুব বিশ্বাস কাজ করে: "আমার এই হারানোটা চিরস্থায়ী নয়।" এই বিশ্বাসই হলো আখিরাত বা পরকালের ধারণা। আখিরাত হলো এমন এক বিচারালয় ও পুরস্কারের মঞ্চ, যেখানে ইনসাফের পাল্লায় প্রতিটি চোখের পানির বিনিময়ে জান্নাতের একেকটি সমুদ্র দেওয়া হবে।

আল্লাহর ইনসাফ: কোনো কিছুই বৃথা যায় না দুনিয়ার বিচার ব্যবস্থায় অনেক সময় মানুষের ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলেন:

"কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে তা সে দেখতে পাবে।" (সূরা যিলযাল: ৭)

মুমিনের হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি মুহূর্ত, তার ধৈর্যের প্রতিটি সেকেন্ড আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত আছে। আখিরাতে আল্লাহ যখন সেই হারানো জিনিসের বিনিময় দেবেন, তখন মুমিন বিস্মিত হয়ে বলবে, "হে আল্লাহ! আমি তো সামান্য কিছু হারিয়েছিলাম, কিন্তু আপনি তো আমাকে যা দিলেন তা আমি কল্পনাও করিনি!"

হারানো সন্তানের বিনিময়ে 'বাইতুল হামদ' সন্তান হারানো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শোক। কিন্তু এই হারানোর বিনিময়ে আল্লাহ যা রেখেছেন, তা শুনলে যেকোনো মুমিনের অন্তর শীতল হয়ে যাবে।

হাদিসে এসেছে, যখন কোনো মুমিনের সন্তান মারা যায়, আল্লাহ ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, "তোমরা কি আমার বান্দার কলিজার টুকরোকে নিয়ে এলে?" তারা বলে, "হ্যাঁ।" আল্লাহ বলেন, "তখন আমার বান্দা কী বলল?" তারা বলে, "সে আপনার প্রশংসা (আলহামদুলিল্লাহ) করেছে এবং ইন্নালিল্লাহ পড়েছে।"

তখন আল্লাহ নির্দেশ দেন, "আমার এই বান্দার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করো এবং তার নাম রাখো 'বাইতুল হামদ' বা প্রশংসার ঘর।" (তিরমিজি)।

গভীর বিশ্লেষণ: দুনিয়াতে একটি সন্তান হয়তো ২০-৩০ বছর আপনার সাথে থাকত। কিন্তু জান্নাতে সেই সন্তান আপনার সাথে থাকবে অনন্তকাল। সেখানে বিচ্ছেদ নেই, বার্ধক্য নেই। তাহলে কি আসলে আপনি সন্তান হারালেন? নাকি জান্নাতে আপনার জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত করলেন?

 

অসুস্থতা ও শারীরিক অক্ষমতার রাজকীয় বদলা

দুনিয়াতে অনেকে পঙ্গুত্ব, অন্ধত্ব বা দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভোগেন। তারা মনে করেন তারা সুস্থ জীবন 'হারিয়েছেন'। কিন্তু পরকালে এর বিনিময় চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো।

     অন্ধদের জন্য: রাসূল (সা.) বলেছেন, "আল্লাহ বলেন, আমি যদি আমার কোনো বান্দার প্রিয় দুটি চোখ নিয়ে নিই এবং সে তাতে সবর করে, তবে আমি তার বিনিময়ে তাকে জান্নাত দান করব।"

     বিপদের তীব্রতা ও সওয়াব: কেয়ামতের মাঠে যখন বিপদগ্রস্ত লোকদের বিপুল সওয়াব দেওয়া হবে, তখন দুনিয়ার সুস্থ মানুষগুলো আক্ষেপ করে বলবে "হায়! দুনিয়াতে যদি আমাদের চামড়াগুলো কাঁচি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করা হতো, তবে আজ আমাদের সওয়াবও কত বেশি হতো!"

দুনিয়ার অপ্রাপ্তি ও জান্নাতের প্রাপ্তি: একটি তুলনা

আমরা অনেক সময় অনেক নেক ইচ্ছা পূরণ করতে পারি না। অভাবের কারণে দান করতে পারি না, অসুস্থতার কারণে হজ করতে পারি না। মুমিনের এই 'না পারা' বা 'অপ্রাপ্তি'গুলোও আল্লাহ সওয়াব হিসেবে লিখে রাখেন।

জান্নাতের বাজার:

জান্নাতে এমন সব বাজার থাকবে যেখানে কোনো কেনাবেচা নেই। আপনি যা চাইবেন, আপনার রূপ-লাবণ্য ঠিক তেমন হয়ে যাবে। দুনিয়াতে যারা নিজেদের সৌন্দর্যের অভাব বোধ করতেন বা হীনম্মন্যতায় ভুগতেন, সেখানে তারা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো সুন্দর।

জান্নাতে বিচ্ছেদের অবসান: পুনর্মিলনের মহোৎসব

মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় প্রিয়জনকে হারানো। মৃত্যু আমাদের থেকে আমাদের বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানদের আলাদা করে দেয়। কিন্তু মুমিনের জন্য এটি কেবল একটি 'সাময়িক বিরতি'।

আল্লাহ বলেন: "যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরা ঈমানে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদের তাদের সাথে মিলিত করে দেব।" (সূরা তুর: ২১)

কল্পনা করুন সেই মুহূর্তের কথা, যখন জান্নাতের দরজায় আপনি আপনার সেই হারানো প্রিয়জনদের সাথে মিলিত হবেন। সেখানে কোনো মৃত্যু নেই, কোনো রোগ নেই, কোনো ঝগড়া নেই। সেই চিরস্থায়ী মিলনের আনন্দের কাছে দুনিয়ার কয়েক বছরের বিচ্ছেদ তখন এক সেকেন্ডের স্বপ্ন বলে মনে হবে।

মুমিনের চূড়ান্ত মুনাফা: আল্লাহর দিদার

আখিরাতে হারানো জিনিসের শ্রেষ্ঠ বিনিময় কোনো হুর বা প্রাসাদ নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহর দর্শন। জান্নাতিরা যখন জান্নাতের সব সুখে ডুবে থাকবে, তখন আল্লাহ তাঁর পর্দার আড়াল থেকে দেখা দেবেন। সেই সৌন্দর্যের সামনে জান্নাতের সব নেয়ামত তুচ্ছ মনে হবে।

সেদিন মুমিন বুঝতে পারবে দুনিয়াতে যা কিছু সে হারিয়েছিল, তার প্রতিটিই ছিল তাকে এই মহান মুহূর্তের যোগ্য করে তোলার এক একটি পরীক্ষা।

হারানো কি আসলেই হারানো?

যদি আপনি একটি লোহার টুকরো হারিয়ে তার বিনিময়ে এক খণ্ড সোনা পান, তবে কি আপনি বলবেন যে আপনার ক্ষতি হয়েছে? অবশ্যই না। মুমিন দুনিয়াতে যা হারায় তা হলো 'লোহা' (ক্ষণস্থায়ী ও তুচ্ছ), আর আখিরাতে সে যা পায় তা হলো 'সোনা' (চিরস্থায়ী ও মহামূল্যবান)।

মুমিনের হারানো কিছু নেই কারণ তার প্রতিটি বিয়োগফল আখেরাতের ব্যাংকে জমাকৃত একটি বিশাল ব্যালেন্স। মৃত্যুর পর যখন সে তার হিসাব দেখবে, সে আফসোস করবে এই বলে যে "কেন আমি দুনিয়াতে আরও বেশি বিপদে পড়লাম না? কেন আমার আরও বেশি সম্পদ হারাল না? আজ তো আমি সেই সবরের বিনিময়ে আল্লাহর আরশের নিচে রাজত্ব করছি!"

দুনিয়াতে আমরা যা কিছু হারাইসেটি হতে পারে অর্থ, স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, প্রিয়জন বা শান্তিজান্নাতে আল্লাহ তার প্রতিটি জিনিসের এমন এক বিকল্প রেখেছেন যা মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "জান্নাতে এমন সব নেয়ামত আছে যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তর কখনো কল্পনাও করতে পারেনি।" (সহীহ বুখারী)।

হারিয়ে যাওয়া যৌবন ও সৌন্দর্যের পূর্ণতা

দুনিয়াতে আমরা বার্ধক্যকে ভয় পাই, সময়ের সাথে সাথে আমাদের রূপ-লাবণ্য হারিয়ে যায়। অনেকে অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার কারণে নিজের অঙ্গহানি ঘটান।

     জান্নাতের প্রতিদান: জান্নাতে প্রবেশের সময় প্রতিটি মুমিনের বয়স হবে ৩৩ বছর। সেখানে কোনো বার্ধক্য নেই, কোনো ক্লান্তি নেই। জান্নাতের অধিবাসীরা হবে আদম (আ.)-এর মতো দীর্ঘ (৬০ হাত উঁচু) এবং ইউসুফ (আ.)-এর মতো সুন্দর।

     প্রতি শুক্রবারের বাজার: হাদিসে এসেছে, জান্নাতে প্রতি শুক্রবার একটি বাজার বসবে। সেখান থেকে উত্তর দিকের হাওয়া বয়ে আসবে এবং জান্নাতিদের মুখমণ্ডল ও পোশাকে সুগন্ধি ছড়িয়ে দেবে। এতে তাদের সৌন্দর্য ও লাবণ্য বহুগুণ বেড়ে যাবে। তারা যখন ঘরে ফিরবে, তাদের পরিবার বলবে "আল্লাহর কসম! আমাদের ছেড়ে যাওয়ার পর তোমাদের সৌন্দর্য তো আরও বেড়ে গেছে!" (সহীহ মুসলিম)।

হারিয়ে যাওয়া সম্পদ ও বিলাসিতার রাজকীয় বদলা

দুনিয়াতে যারা অভাবের কারণে অনেক শখ পূরণ করতে পারেননি বা আল্লাহর পথে নিজের সম্পদ অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাতের ঘরগুলো হবে বিস্ময়কর।

     জান্নাতের অট্টালিকা: জান্নাতের একটি ইট হবে সোনার আর একটি হবে রুপার। এর সিমেন্ট হবে সুগন্ধি কস্তুরী, পাথর হবে মুক্তা ও ইয়াকুত আর মাটি হবে জাফরান।

     হীরার তাবু: জান্নাতে একটি মুক্তার তৈরি তাবু থাকবে যা মাঝখানে ফাঁপা এবং এর উচ্চতা হবে আকাশে ৬০ মাইল পর্যন্ত। সেখানে মুমিনের জন্য এমন সব নেয়ামত থাকবে যা সে একা ভোগ করে শেষ করতে পারবে না।

     সোনার থালা ও পানপাত্র: দুনিয়াতে যারা রেশম পরেনি বা সোনার পাত্রে খায়নি আল্লাহর নির্দেশে, জান্নাতে তাদের পোশাক হবে রেশমের এবং প্রতিটি পানপাত্র হবে স্বর্ণ ও রৌপ্যের।

      

 

 

 

জাগতিক সুস্বাদু খাবারের অনন্ত প্রবাহ

ক্ষুধা বা দারিদ্র্যের কারণে যারা দুনিয়াতে কষ্ট পেয়েছেন, জান্নাতে তাদের জন্য থাকবে অফুরন্ত ভোজ।

     পাখির গোশত ও ফলমূল: জান্নাতিরা যখন কোনো পাখির দিকে তাকিয়ে মনে মনে সেটি খাওয়ার ইচ্ছা করবে, সাথে সাথে সেটি ভুনা হয়ে তাদের সামনে হাজির হবে। কোনো ফল ছিঁড়তে চাইলে গাছের ডাল নিজে থেকেই তাদের হাতের কাছে নেমে আসবে।

     জান্নাতের শরাব: এমন এক পবিত্র পানীয় যা পান করলে কোনো মাথা ব্যথা হবে না বা কেউ মাতাল হবে না। এর স্বাদ হবে দুনিয়ার যেকোনো পানীয়র চেয়ে কোটি গুণ বেশি।

নিঃসঙ্গতার বিপরীতে জান্নাতের সঙ্গী-সাথী

দুনিয়াতে যারা একাকীত্বে ভুগেছেন, স্বামী বা স্ত্রী হারিয়েছেন কিংবা প্রিয়জনদের বিচ্ছেদ সয়েছেন

     হুর ও গিলমান: মুমিন পুরুষদের জন্য থাকবে আয়তলোচনা হুর এবং নারীদের জন্য থাকবে তাদের দুনিয়ার স্বামী (যদি তারা জান্নাতি হন) অথবা আল্লাহ তাদের জন্য শ্রেষ্ঠ সঙ্গীর ব্যবস্থা করবেন। হুরদের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে নবীজি (সা.) বলেছেন, যদি জান্নাতের কোনো নারী পৃথিবীর দিকে উঁকি দেয়, তবে আসমান ও জমিনের মাঝখানের সব কিছু আলোকিত ও সুগন্ধে ভরে যাবে।

     সেবক (গিলমান): জান্নাতিদের সেবার জন্য মুক্তার মতো সুন্দর কিশোরেরা ঘুরে বেড়াবে, যারা তাদের প্রতিটি ইচ্ছা মুহূর্তের মধ্যে পূরণ করবে।

হারানো শান্তির চূড়ান্ত ঠিকানা: 'দারুস সালাম'

দুনিয়াতে আমরা জ্যাম, কোলাহল, ঝগড়া আর দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকি। জান্নাতের সবচেয়ে বড় নেয়ামত হলো 'মানসিক প্রশান্তি'।

     সেখানে কোনো গিবত নেই, মিথ্যা নেই, মন্দ কথা নেই। সবাই সবার প্রতি থাকবে পরম শ্রদ্ধাশীল।

     আল্লাহ তায়ালা বলেন: "আমি তাদের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ বের করে দেব, তারা ভাই ভাই হয়ে মুখোমুখি আসনে বসবে।" (সূরা হিজর: ৪৭)।

মুমিনের পরম প্রাপ্তি: দুনিয়াতে আমরা কত ছোটখাটো মানুষের সন্তুষ্টির জন্য কত কিছু 'হারাই'। কিন্তু জান্নাতে স্বয়ং মহাবিশ্বের স্রষ্টার সন্তুষ্টি পাওয়া হবে মুমিনের চূড়ান্ত বিজয়। এই একটি মুহূর্তের জন্য দুনিয়ার হাজার বছরের কষ্টকেও তুচ্ছ মনে হবে।

এই দীর্ঘ আলোচনার শেষে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে মুমিনের জীবনে 'হারানো' শব্দটি একটি বিভ্রান্তি মাত্র। মুমিন যা হারায়:

১. তা হয় তার জন্য ক্ষতিকর ছিল।

২. অথবা সেটি তার জান্নাতের সওয়াব বাড়ানোর একটি মাধ্যম।

৩. অথবা সেটি পরকালে আরও উন্নত রূপে ফিরে পাওয়ার একটি বিনিয়োগ।

একজন মুমিন যখন এই পূর্ণাঙ্গ দর্শন নিয়ে বাঁচে, তখন তার মন থেকে হতাশা, ডিপ্রেশন এবং অপ্রাপ্তির হাহাকার চিরতরে মুছে যায়। সে তখন প্রতিটি সূর্যোদয়ে আল্লাহর রহমত দেখে এবং প্রতিটি সূর্যাস্তে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।

মুমিনের হারানো কিছু নেই, কারণ তার সবটুকুই আল্লাহর জন্য, আর আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দাকে নিঃস্ব করেন না।

 

∫মুমিনের হারানো কিছু নেই∫

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.