সোসাল মিডিয়ার ওপারে মোঃ শামছুদ্দিন বাবলু


সোসাল মিডিয়ার ওপারে বাস্তব জীবন




কেন আপনি এই বইটি পড়বেন?

এই মুহূর্তে বইটি আপনার হাতে থাকার অর্থ হলোমহাবিশ্বের প্রতিপালক আপনাকে এক চরম ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে চান। এটি কোনো সাধারণ বই নয়, এটি আপনার পকেটে থাকা পাঁচ ইঞ্চির সেই কাঁচের আয়নাটার এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ, যা আপনাকে প্রতিনিয়ত একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে

আসুন, খুব সততার সাথে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করি:

১. গত এক সপ্তাহে এমন কয়টি রাত গেছে, যখন আপনি ফোনটা দূরে রেখে পরম শান্তিতে চোখের পাতা এক করেছেন?

২. শেষ কবে আপনি নামাজের সিজদায় গিয়ে দুনিয়ার সমস্ত নোটিফিকেশন ভুলে আল্লাহর সাথে একান্ত কথোপকথনে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছেন?

৩. আপনার কি মনে হয় না, ফেসবুকের নিউজফিড, টিকটকের রিলস আর কমেন্ট বক্সের অর্থহীন যুদ্ধগুলো আপনার ভেতরের আসল মানুষটাকে, আপনার মেধা আর ঈমানী তেজকে একবারে খোকলা করে দিচ্ছে?

আমরা এক অদ্ভুত ফিতনার যুগে বাস করছি। মাদক বা অস্ত্রের নেশা মানুষকে সামাজিকভাবে সতর্ক করে, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার এই নীরব আসক্তি মানুষকে ধার্মিকতার ছদ্মবেশে, বিনোদনের আড়ালে এক চিরস্থায়ী আধ্যাত্মিক মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। আমরা ভাবি আমরা শুধু একটা স্ক্রল করছি, অথচ আমরা আসলে আমাদের আখেরাত আর জান্নাতকে বিক্রি করে দিচ্ছি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ডোপামিন হিটের কাছে

এই বইটি আপনার জন্য, কারণ:

  • এটি আপনাকে শেখাবে কীভাবে লাইকের মরীচিকা ভেঙে খাঁটি ভালোবাসার সন্ধান পেতে হয়
  • এটি আপনার চোখের সামনে উন্মোচন করবে কীভাবে মাত্র এক মিনিটের একটি 'হারাম ক্লিক' আপনার পুরো দিনের ইবাদতের স্বাদ কেড়ে নেয়
  • এটি আপনাকে দেখাবে ভার্চুয়াল ফ্রেন্ডলিস্টের ৫ হাজার মানুষের ভিড়েও কেন আপনি একা, এবং কীভাবে জায়নামাজের নিস্তব্ধতায় সেই একাকীত্ব দূর করা যায়
  • সর্বোপরি, এটি আপনাকে একজন 'ডিজিটাল কয়েদি' থেকে মুক্ত করে আল্লাহর একজন স্বাধীন, পবিত্র ও মুখলিস 'দাঈ' হিসেবে বাঁচতে সাহায্য করবে

স্ক্রিনের আলো সাময়িক, কিন্তু ঈমানের আলো চিরস্থায়ী। এই বইটি পড়ার পর যখন আপনি আপনার ফোনের স্ক্রিনটা অফ করবেন, তখন আপনি আর পুরোনো আপনি থাকবেন না। আপনি আবিষ্কার করবেন এক নতুন নিজেকে, যে ভার্চুয়াল জীবনের ফাঁদ ছিঁড়ে সত্যিকারে জেগে উঠেছে

 

 

আমরা কি স্ক্রিনের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছি?

 

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু একটা মৃদু নীল আলো জ্বলছে ঘরের কোণে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত দুইটা। চারপাশ নিঝুম, সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন। কিন্তু বিছানায় শুয়ে থাকা আঠারো বছর বয়সী তরুণটির চোখে ঘুম নেই। তার ডান হাতের বুড়ো আঙুলটি এক টানা স্ক্রিনের ওপর নিচে ওঠানামা করছে। স্ক্রল, স্ক্রল এবং আরও একটা স্ক্রল।

কখন যে রাত এগারোটা থেকে দুটো বেজে গেল, সে টেরই পায়নি। চোখের নিচে কালচে দাগ, মস্তিষ্ক ক্লান্ত, শরীর চাইছে একটু বিশ্রামকিন্তু ভেতরের এক অদৃশ্য টান তাকে স্ক্রিন থেকে চোখ সরাতে দিচ্ছে না। আর মাত্র একটা ভিডিও, আর মাত্র কয়েকটা কমেন্ট, আর মাত্র একবার নোটিফিকেশন চেক করা...।

এই দৃশ্যটি আজ আর কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং আমাদের প্রতিটি ঘরের চেনা বাস্তব। আমরা কি কখনো ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছি, আমরা আসলে কোথায় বাস করছি? আমাদের শরীরটা এই বাস্তব পৃথিবীতে থাকলেও, আমাদের মন, মনোযোগ আর চিন্তা কোথায় পড়ে আছে?

আমরা সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে আকাশের সূর্য খুঁজি না, খুঁজি বালিশের পাশে থাকা প্লাস্টিক আর কাঁচের তৈরি ওই চারকোনা ডিভাইসটি। কার কয়টা মেসেজ এলো, কে আমার পোস্টে রিঅ্যাকশন দিল, দুনিয়ায় নতুন কী ট্রেন্ড চলছেএসব জানার জন্য আমাদের মন ব্যাকুল হয়ে থাকে। অজান্তেই আমরা এক অদ্ভুত ভার্চুয়াল মায়াজালে বন্দি হয়ে পড়েছি।

বিজ্ঞাপন, রিলস, শর্টস আর নিউজফিডের অন্তহীন মহাসমুদ্রে আমরা প্রতিনিয়ত ডুব দিচ্ছি। কিন্তু ভয়ের ব্যাপার হলো, এই ডুব দিয়ে আমরা কি মুক্তো কুড়োচ্ছি, নাকি আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছি?

আমাদের মনোযোগের ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে, বাবা-মা কিংবা পরিবারের সাথে মুখোমুখি বসে দুটো সুখ-দুঃখের কথা বলার সময় সংকুচিত হয়ে আসছে। এমনকি সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো, এই স্ক্রিনের আলো আমাদের অন্তরকে এতটাই আচ্ছন্ন করে ফেলছে যে, ইবাদতের মিষ্টি স্বাদ, কোরআন তিলাওয়াতের শান্তি আর আল্লাহর সাথে একাকী কথা বলার ব্যাকুলতা আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

আমরা ভাবছি আমরা সোশ্যাল মিডিয়া 'ব্যবহার' করছি। কিন্তু একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সোশ্যাল মিডিয়াই আসলে আমাদের 'নিয়ন্ত্রণ' করছে। আমাদের আবেগ, আমাদের রাগ, আমাদের ভালোবাসা, এমনকি আমাদের দ্বীনি আমলও এখন নির্ধারিত হচ্ছে স্ক্রিনের ওপার থেকে আসা লাইক, কমেন্ট আর ভিউয়ের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে।

এই বইটির উদ্দেশ্য কাউকে প্রযুক্তি থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া নয়। প্রযুক্তি আল্লাহর দেওয়া এক নিয়ামত হতে পারে, যদি তা সঠিক পথে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যখন সেই নিয়ামত আমাদের অন্ধ করে দেয়, আমাদের আখেরাতকে ভুলিয়ে দেয় এবং আমাদের এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বন্দি করে ফেলে, তখন সময় এসেছে থামার। চোখ কচলে একটু চারদিকে তাকানোর। নিজেকে প্রশ্ন করার"আমি কি আসলেই ভালো আছি? নাকি আমি এক অনন্ত স্ক্রিনের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছি?"

চলুন, এই কৃত্রিম আলোর ওপারে গিয়ে আসল আলোর সন্ধান করি। আমাদের হারিয়ে যাওয়া নিজেকে খুঁজে বের করার যাত্রা শুরু হোক এখান থেকেই...।

 

 

 অধ্যায় ১

 

লাইক আর ভালোবাসার পার্থক্য

 

ক্যাম্পাসের করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ও রিয়াজের চোখজোড়া আটকে থাকে ফোনের স্ক্রিনে। ঠিক বিশ মিনিট আগে সে তার একটা নতুন ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছে। নীল শার্ট, চোখে সানগ্লাস, পেছনে ধানমন্ডি লেকের চমৎকার ব্যাকগ্রাউন্ড।  ক্যাপশনে লিখেছেLife is beautiful when you know how to live it.

পোস্ট করার পর প্রথম পাঁচ মিনিটে লাইক এসেছিল ২২টি।  পরের দশ মিনিটে সেটা গিয়ে দাঁড়াল ৮৫-তে। রিয়াজের হৃৎস্পন্দন যেন লাইকের সংখ্যার সাথে সাথে বাড়ছে। প্রতিবার স্ক্রিনটা ওপর থেকে নিচে টেনে সে রিফ্রেশ করছে, আর নতুন দুটো লাইক বা একটা লাভ রিঅ্যাক্ট দেখলেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠছে।

ক্যাম্পাসের ক্যাফেটেরিয়ায় বন্ধুদের আড্ডায় রিয়াজ সশরীরে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে সে অন্য দুনিয়ায়।  সায়েদ একটা জরুরি কথা বলছিল, কিন্তু রিয়াজ সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে পকেট থেকে আবার ফোনটা বের করল।

দোস্ত, তুই কি আমার কথা শুনছিস? সায়েদ একটু বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করল।

রিয়াজ স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, হুম শুনছি, তুই বল। একটু জরুরি চেক করছি।

আসলে কোনো জরুরি কাজ নয়।  রিয়াজ শুধু দেখছিল, তার পোস্টে ক্যাম্পাসের জনপ্রিয় বড় ভাই কিংবা কোনো চেনা আপু কমেন্ট করল কিনা।  এই লাইক, কমেন্ট আর ভার্চুয়াল প্রশংসার নেশা রিয়াজকে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে বন্দি করে ফেলেছে।  তার মনে হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় যত বেশি রিঅ্যাকশন পাওয়া যাবে, জীবনে সে তত বেশি সফল এবং জনপ্রিয়। মানুষের এই তাৎক্ষণিক প্রশংসাই এখন তার বেঁচে থাকার প্রধান জ্বালানি।

 

প্রশংসার অদৃশ্য ফাঁদ

 

রিয়াজ একা নয়। বর্তমান প্রজন্মের এক বিরাট অংশের মানসিক অবস্থা ঠিক এই তরুণটির মতোই।  আমরা সকাল-বিকেল সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালে আমাদের জীবনের সেরা মুহূর্তগুলো, সেরা পোশাকের ছবি কিংবা সেরা চিন্তাভাবনাগুলো ঝুলিয়ে দিই। উদ্দেশ্য একটাইমানুষের একটুখানি মনোযোগ বা ভ্যালিডেশন পাওয়া।

এই যে মানুষের বাহবা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, একে মনস্তত্ত্বের ভাষায় বলা হয় সোশ্যাল মিডিয়া ডোপামিন হিট।  প্রতিবার যখন ফোনের স্ক্রিনে একটা নোটিফিকেশন ভেসে ওঠে, তখন আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের এক রাসায়নিকের ক্ষরণ হয়, যা আমাদের ক্ষণস্থায়ী আনন্দ দেয়।  এই আনন্দটা এতটাই আসক্তিপূর্ণ যে, মানুষ তখন বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জীবনের কৃত্রিম প্রশংসাকে বেশি আপন মনে করতে শুরু করে।

কিন্তু ইসলাম আমাদের এই মানসিকতাকে খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে এবং এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করেছে।  মানুষের প্রশংসাকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে ফেলার এই প্রবণতা মানুষকে একসময় রিয়া বা লোকদেখানো মানসিকতার দিকে ঠেলে দেয়।

রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

আমি তোমাদের উপর যে জিনিসটিকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হলো ছোট শিরক। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ছোট শিরক কী? তিনি বললেন, রিয়া (লোকদেখানো আমল)। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৮১)

ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই লাইক আসলে এক ধরনের আধুনিক রিয়া-র ফাঁদ।  এখানে মানুষ নিজের সততা, জ্ঞান কিংবা সৌন্দর্যকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়, বরং শত-সহস্র অচেনা মানুষের কাছ থেকে সস্তা কিছু ডিজিটাল রিঅ্যাকশন পাওয়ার জন্য প্রদর্শন করে।

 

লাইক বনাম প্রকৃত ভালোবাসা

 

রিয়াজ একসময় খেয়াল করল, যেদিন তার কোনো পোস্টে লাইক কম আসে, সেদিন তার মন ভীষণ খারাপ থাকে।  ঘরের ভেতরে সে খিটখিটে মেজাজ করে, মায়ের সাথে চড়া গলায় কথা বলে।  অথচ ভার্চুয়াল দুনিয়ায় তার পরিচিতি একজন ভদ্র, নম্র এবং হাসিখুশি ছেলে হিসেবে। তার এক একটা পোস্টে শত শত মানুষ মন্তব্য করেভাইয়া, আপনার স্বভাবটা দারুণ! কিংবা আপনাকে দেখলে মন জুড়িয়ে যায়।

এখানেই লুকিয়ে আছে এক মস্ত বড় বৈপরীত্য।  স্ক্রিনের ওপারে থাকা যে মানুষগুলো একটা লাইক বোতামে চাপ দিচ্ছে, তারা কি আসলেই রিয়াজকে ভালোবাসে? রিয়াজ যদি আজ রাতে অসুস্থ হয়ে পড়ে, সেই ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টের পাঁচ হাজার মানুষের কয়জন তার শিয়রে এসে বসবে? কয়জন তার জন্য তাহাজ্জুদে চোখের পানি ফেলবে?

উত্তরটা আমাদের সবার জানাকেউ না।

সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক হলো সস্তা এবং সাময়িক। এটা কোনো মানুষের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার প্রমাণ নয়।  এটা কেবল একটা আঙুলের ছোঁয়া, যা এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে দেওয়া যায় এবং পরের সেকেন্ডেই ভুলে যাওয়া যায়।

অথচ প্রকৃত ভালোবাসা অন্য জিনিস।  প্রকৃত ভালোবাসা হলো সেই অনুভূতি, যা কোনো স্বার্থ ছাড়া, কোনো প্রদর্শনী ছাড়া টিকে থাকে। একজন মুমিনের জীবনে প্রকৃত ভালোবাসা আসে প্রথমত আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর দ্বিতীয়ত সেইসব মানুষের কাছ থেকে যারা তাকে আল্লাহর স্বার্থেই ভালোবাসেযেমন মা-বাবা, পরিবার এবং দ্বীনি ভাই।

হাদিসে কুদসিতে এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরাইল (আ.)-কে ডেকে বলেন, আমি অমুককে ভালোবাসি, তাই তুমিও তাকে ভালোবাসো। অতঃপর জিবরাইল (আ.) আকাশে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। তখন আকাশের অধিবাসীরাও তাকে ভালোবাসতে শুরু করে। এরপর পৃথিবীর মানুষের অন্তরেও তার জন্য ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা ঢেলে দেওয়া হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২০৯)

আকাশের অধিবাসীদের এই যে ভালোবাসা, এর জন্য কোনো ক্যামেরা ফিল্টারের প্রয়োজন হয় না, কোনো চটকদার ক্যাপশনের দরকার হয় না। প্রয়োজন হয় শুধু অন্তরের ইখলাস বা নিষ্ঠা।

 

 

রিয়াজের উপলব্ধি

 

একদিন মাঝরাতে রিয়াজের হঠাৎ প্রচণ্ড বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল।  শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তার।  অন্ধকারে সে বিছানায় উঠে বসল।  টেবিলে রাখা ফোনটা তুলে নেওয়ার শক্তিও যেন তার ছিল না।  সে এক চরম একাকীত্ব আর শূন্যতা অনুভব করল।

সে ভাবল, এই মুহূর্তে যদি তার বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তার টাইমলাইনের ফলোয়াররা বড়জোর একটা Sad রিঅ্যাক্ট দেবে কিংবা কমেন্ট বক্সে লিখবে Rest in peace বা Inna lillahi wa inna ilayhi raji'un।  ব্যস, এটুকুই।  এরপর তারা আবার স্ক্রল করে অন্য কোনো বিনোদনমূলক ভিডিওতে চলে যাবে।  তার এই কষ্ট, এই শূন্যতা ভার্চুয়াল দুনিয়ার কারও মনে বিন্দুমাত্র দাগ কাটবে না।

ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের ঘর থেকে রিয়াজের মা এসে তার কপালে হাত দিলেন।  মায়ের চোখে রাজ্যের দুশ্চিন্তা।  মা পরম মমতায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন এবং মুখে আল্লাহর নাম জপতে লাগলেন।

রিয়াজের চোখ দিয়ে তখন অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।  সে বুঝতে পারল, সে এতকাল এক মরীচিকার পেছনে ছুটছিল। স্ক্রিনের ওপার থেকে আসা হাজারটা কৃত্রিম লাইক আর মায়ের এই এক ফোঁটা খাটি ভালোবাসার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত, তা সে আজ প্রথম সম্যক উপলব্ধি করতে পারল।  সে মানুষের তৈরি করা প্রশংসার খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দেওয়া প্রকৃত সম্পর্কের মূল্য বুঝতে শিখল।

মানুষের ওয়ালে নিজের গ্রহণযোগ্যতা খোঁজার চেয়ে, আল্লাহর দরবারে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করাটাই যে জীবনের আসল উদ্দেশ্যএই সত্যটি রিয়াজের হৃদয়ে এক নতুন জাগরণের জন্ম দিল।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অধ্যায় ২

 

এক মিনিটের ভিডিও, এক ঘণ্টার গুনাহ

 

রাত তখন পৌনে একটা।  চারপাশ নিঝুম।  আবিদের ঘরের বাতিটা অনেক আগেই নিভে গেছে, কিন্তু অন্ধকারের মাঝে তার বিছানা থেকে একটা তীব্র নীলচে আলো এসে পড়ছে তার মুখে।  সে কম্বলটা মুড়ি দিয়ে এক হাত দিয়ে ফোনটা ধরে আছে, আর অন্য হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে স্ক্রিনটা অনবরত ওপরের দিকে ঠেলে যাচ্ছে।

ফেসবুক রিলস আর টিকটকের দুনিয়া। একেকটা ভিডিও বড়জোর ৩০ সেকেন্ড থেকে এক মিনিটের।  একটা শেষ হতে না হতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠছে আরেকটি।  কোনোটা মজার কৌতুক, কোনোটা চমৎকার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের সাথে কোনো তরুণীর হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য, আবার কোনোটা চটকদার কোনো ট্রাভেল ব্লগ।

আবিদ নিজেকে বুঝিয়েছিল, আজ সারা দিন অনেক পড়াশোনা করেছি, মাথাটা জ্যাম হয়ে আছে।  জাস্ট পাঁচটা মিনিট একটু রিলস দেখে মনটা হালকা করে ঘুমিয়ে পড়ব।

কিন্তু এই পাঁচ মিনিট কখন যে এক ঘণ্টায় রূপ নিয়েছে, আবিদ নিজেও তা টের পায়নি। শর্ট-ভিডিওর অ্যালগরিদমগুলো তৈরিই করা হয়েছে মানুষের মনস্তত্ত্বকে বন্দি করার জন্য।  একটির পর একটি এমন সব ভিডিও চোখের সামনে আসতে থাকে, যা মানুষের কৌতুহলকে ধরে রাখে এবং মস্তিষ্ককে কোনো বিরতি নেওয়ার সুযোগ দেয় না।

স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ আবিদের সামনে একটা ভিডিও এলো।  ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা ট্রেন্ডি গান বাজছে, আর একটি মেয়ে আধুনিক পোশাকে নাচছে। আবিদের অবচেতন মন বলল, ভিডিওটা স্কিপ কর, এটা দেখা ঠিক হচ্ছে না।  কিন্তু তার আঙুলটা থমকে গেল।  সে ভাবল, মাত্র তো কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, দেখিই না কী আছে!

সে ভিডিওটি দেখল। এক মিনিট শেষ হলো।  কিন্তু গল্পটা সেখানেই শেষ হলো না।  সেই এক মিনিটের একটি মাত্র ক্লিক আবিদের মনের ভেতর এক অদৃশ্য বিষাক্ত বীজ বুনে দিল।

 

ডিজিটাল যুগের ক্ষুদ্র গুনাহ

 

আমাদের সমাজে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে, গুনাহ মানেই বড় কোনো অপরাধযেমন চুরি করা, ডাকাতি করা বা সরাসরি কোনো বড় পাপে লিপ্ত হওয়া।  কিন্তু ডিজিটাল যুগে গুনাহের সংজ্ঞা ও ধরণ অনেক সূক্ষ্ম এবং ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।  আমরা অনেকেই মনে করি, ফোনের স্ক্রিনে একটা এক মিনিটের রিলস বা শর্টস দেখা আর এমন কী বড় অপরাধ! কেউ তো দেখছে না, সমাজেও কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।

কিন্তু ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, গুনাহ ছোট হলেও তার একটা দীর্ঘমেয়াদী এবং গভীর কুপ্রভাব রয়েছে মানুষের অন্তরে।  বিশেষ করে চোখের গুনাহ, যা আধুনিক যুগে এই স্মার্টফোনের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে মুমিনদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন:

মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্রতার মাধ্যম। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত। (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩০)

এই আয়াতে আল্লাহ দৃষ্টি নত রাখাকে পবিত্রতার মাধ্যম বলেছেন। এর বিপরীত অর্থ হলো, দৃষ্টিকে যখন অবাধে ছেড়ে দেওয়া হয়, বিশেষ করে স্ক্রিনের নিষিদ্ধ ও অর্ধনগ্ন দৃশ্যের দিকে, তখন মানুষের অন্তরের পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যায়।

একটি এক মিনিটের ভিডিও হয়তো দেখতে মাত্র ৬০ সেকেন্ড সময় নেয়, কিন্তু সেই দৃশ্যটি মানুষের মস্তিষ্কে এবং কল্পনায় স্থান করে নেয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।  আবিদ যখন ফোনটা রেখে চোখ বন্ধ করল, তখন সে ঘুমাতে পারল না।  সেই এক মিনিটের ভিডিওর দৃশ্যগুলো, গানের সুরগুলো তার মনের পর্দায় বারবার ভেসে উঠতে লাগল।  সে নামাজে দাঁড়াল না ঠিকই, কিন্তু তার চিন্তা ও মানসিকতা এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সেই গুনাহের আবর্তে ঘুরপাক খেতে লাগল।

 

অন্তরের কালো দাগ

 

ছোট ছোট গুনাহ কীভাবে একজন মানুষের আমল ও চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয়, তা আল্লাহর রাসূল একটি চমৎকার উদাহরণের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন।

তিনি বলেছেন:

বান্দা যখন একটি গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। এরপর সে যখন গুনাহের কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তাওবা করে, তখন তার অন্তরটি আবার পরিষ্কার ও চকচকে হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি আবার গুনাহের পুনরাবৃত্তি করে, তবে সেই কালো দাগটি বাড়তে থাকে এবং একসময় তার পুরো অন্তরকে ঢেকে ফেলে। (সূনান আত-তিরমিযী, হাদিস: ৩৩৩৪)

আজকের তরুণ সমাজের এক বিরাট অংশ রাতের পর রাত এই অন্তরের কালো দাগ নিয়ে ঘুমাতে যাচ্ছে। এক মিনিটের একটা রিলস, একটা ইনস্টাগ্রাম পোস্ট কিংবা একটা মিউজিক ভিডিও দেখতে দেখতে অন্তরে যে ছোট ছোট কালো দাগগুলো পড়ছে, তা একসময় পুরো অন্তরকে শক্ত পাথরের মতো করে ফেলে।

এর ফল কী হয়? আবিদ খেয়াল করল, ইদানীং তার আর নামাজে মনোযোগ বসে না।  কোরআন তিলাওয়াত করতে বসলে পাঁচ মিনিটেই ক্লান্তি চলে আসে।  অথচ ফোনে দুই ঘণ্টা স্ক্রল করলেও বিন্দুমাত্র ক্লান্তি লাগে না।  দ্বীনি কোনো আলোচনা বা ভালো কথা শুনলে মন মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।  এই যে ইবাদতের প্রতি অনীহা এবং গুনাহের প্রতি আকর্ষণএটা অন্য কিছু নয়, বরং সেই এক মিনিটের অসংখ্য গুনাহের পুঞ্জীভূত ফলাফল, যা তার অন্তরের আলো কেড়ে নিয়েছে।

 

 

 

 

এক সেকেন্ডের ক্লিক, অনন্তকালের হিসাব

 

আবিদ পরদিন ভোরে ফজরের আযানের সময় যখন চোখ মেলল, তখন তার শরীর ও মন দুটোই প্রচণ্ড ক্লান্ত।  রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে না পারায় মাথাটা ঝিমঝিম করছে।  সে আযানের শব্দ শুনল, কিন্তু বিছানা ছেড়ে ওঠার মতো মানসিক শক্তি যেন তার ভেতর অবশিষ্ট নেই।  এক মিনিটের একটা হারাম ক্লিক তাকে ফজরের মতো মহান ইবাদত থেকে বঞ্চিত করে দিল।

সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবল, আমরা কত সহজে একটা ভিডিওতে ক্লিক করি, কত সহজে একটা রিলস দেখে ফেলি।  অথচ আমরা ভুলে যাই, কিয়ামতের দিন আমাদের এই চোখ, এই আঙুলসবকিছুর হিসাব দিতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তরের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে। (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৬)

ডিজিটাল দুনিয়ার কোনো সেশন বা ব্রাউজিং হিস্ট্রি হয়তো আমরা ক্লিয়ার হিস্ট্রি বা ইনকগনিটো মোড ব্যবহার করে মানুষের চোখ থেকে লুকিয়ে ফেলতে পারি, কিন্তু আল্লাহর ফেরেশতাদের ডায়েরি থেকে তা মুছে ফেলা অসম্ভব। এক মিনিটের সেই গুনাহের ভিডিওর রেকর্ড আল্লাহর দরবারে সংরক্ষিত থেকে যায়, যদি না আমরা খাঁটি অন্তরে তাওবা করি।

আবিদ সেদিন বিছানা থেকে উঠে ওজু করল। জায়নামাজে দাঁড়িয়ে সে আল্লাহর কাছে কেঁদে ফেলল। সে বুঝতে পারল, তার এই অভ্যস্ত আঙুলকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, এই এক মিনিটের গুনাহগুলো একসময় তাকে চিরস্থায়ী ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। সে প্রতিজ্ঞা করল, এরপর থেকে প্রতিবার স্ক্রিনের সামনে বসার আগে সে নিজেকে মনে করিয়ে দেবেআল্লাহ আমাকে দেখছেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অধ্যায় ৩

 

অদৃশ্য শৃঙ্খল

 

রুমে ঢুকেই ফারহানের মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পড়ার টেবিলটা গোছানো, বইগুলো খোলাই পড়ে আছে, কিন্তু ফারহানের হাত দুটো টেবিলের নিচে। মায়ের পায়ের শব্দ পেয়ে সে চমকে উঠে দ্রুত হাতটা ওপরে তুলল। ফোনের স্ক্রিনটা তখনো জ্বলজ্বল করছে।

ফারহান, এই নিয়ে আজ তিনবার এলাম। তুই বললি অ্যাসাইনমেন্ট করছিস, অথচ প্রতিবারই দেখছি তোর হাত ফোনের দিকে! মায়ের কণ্ঠে স্পষ্ট ক্ষোভ ও হতাশা।

ফারহান আমতা আমতা করে বলল, মা, আসলে একটা নোটিফিকেশন এসেছিল... ওটা একটু চেক করছিলাম। এই তো এখনই পড়তে বসছি।

মা ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর ফারহান ফোনটা টেবিলের এক কোণে উল্টো করে রাখল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, আগামী এক ঘণ্টা সে ফোন স্পর্শও করবে না। কিন্তু ঠিক পাঁচ মিনিট পার হতেই তার মনে এক তীব্র ছটফটানি শুরু হলো। তার অবচেতন মন বলতে লাগলফেসবুকের সেই গ্রুপটায় যে পোস্টটা দিয়েছিলাম, ওটায় কেউ নতুন কোনো কমেন্ট করল না তো? একটু দেখে নিই, জাস্ট দশ সেকেন্ড!

সে আবার ফোনটা হাতে নিল।  দশ সেকেন্ডের জন্য ঢুকে সে দেখতে পেল তার এক বন্ধু ইনবক্সে একটা মজার মিম পাঠিয়েছে। ফারহান সেটার উত্তর দিল। এরপর আরেকজন বন্ধুর প্রোফাইলে ঢুকল, সেখান থেকে একটা নিউজ পোর্টালে, তারপর ইউটিউবের একটা শর্টস-এ।

যখন ফারহানের হুঁশ ফিরল, তখন ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে তার চোখ কপালে উঠল।  আরও ৪৫ মিনিট হাওয়া! অথচ এই ৪৫ মিনিটে সে তার অ্যাসাইনমেন্টের একটা লাইনও লেখেনি।

ফারহান নিজেকে আবিষ্কার করল এক অদৃশ্য লোহার শৃঙ্খলে বন্দি হিসেবে।  এই শৃঙ্খল চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর বাঁধন এতটাই শক্ত যে সে চাইলেও নিজের ইচ্ছামতো ফোনটা দূরে সরিয়ে রাখতে পারছে না।  সে এই ডিজিটাল খাঁচার একজন আসক্ত কয়েদি।

 

আসক্তির মনস্তত্ত্ব ও সময়ের অপচয়

 

আমরা অনেকেই মনে করি আসক্তি বা অ্যাডিকশন মানেই কেবল মাদক বা ড্রাগসের নেশা। কিন্তু আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি মাদকের চেয়ে কোনো অংশে কম ক্ষতিকর নয়। ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম বা এক্স (টুইটার)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারী একবার ঢুকলে সহজে বের হতে না পারে। একে বলা হয় ইনফিনিট স্ক্রলিং বা সীমাহীন স্ক্রলিং। অর্থাৎ, আপনি যতই নিচের দিকে যাবেন, কন্টেন্ট কখনো শেষ হবে না।

এই অদৃশ্য শৃঙ্খল আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটিকে কেড়ে নিচ্ছেআর তা হলো সময়

ইসলামে সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। সময় কোনো সাধারণ জিনিস নয়, এটি মানুষের জীবন। যে সময়টুকু চলে যাচ্ছে, তা আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যাবে না।

রাসূলুল্লাহ এই নিয়ামতের অবহেলা সম্পর্কে আমাদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন:

দুটি নিয়ামত এমন রয়েছে, যে দুটিতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত ও ধোঁকায় পতিত। নিয়ামত দুটি হলো: সুস্থতা এবং অবসর সময়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)

আমরা যখন কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া, কেবল সময় কাটানোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় বছরের পর বছর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করছি, তখন আমরা আসলে জীবনের সবচেয়ে বড় ধোঁকার মধ্যে বাস করছি। এই অবসর সময়টুকুকে আমরা জ্ঞান অর্জন, ক্যারিয়ার গঠন কিংবা দ্বীনের চর্চায় লাগাতে পারতাম; অথচ তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে এক অন্তহীন এবং অর্থহীন ফিডের ভেতর।

 

কিয়ামতের দিনের সেই পাঁচ প্রশ্ন

 

ফারহান প্রায়ই ভাবত, সময় নষ্ট হচ্ছে তো কী হয়েছে? আমি তো কারও কোনো ক্ষতি করছি না। নিজের ঘরে বসে নিজের ফোনই তো টিপছি। তরুণ সমাজের অনেকের চিন্তাভাবনাও ঠিক এমন।

কিন্তু ইসলাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবনটা সম্পূর্ণ তার নিজের খেয়ালখুশিমতো কাটানোর জন্য দেওয়া হয়নি। প্রতিটি সেকেন্ডের জন্য আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা এক কদমও নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে:

১. তার জীবনকাল সে কোন কাজে অতিবাহিত করেছে?

২. তার যৌবনকাল সে কোন কাজে ক্ষয় করেছে?

৩. তার ধন-সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে?

৪. এবং কোন খাতে তা ব্যয় করেছে?

৫. সে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল, সে অনুযায়ী কী আমল করেছে? (সূনান আত-তিরমিযী, হাদিস: ২৪১৬)

একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই গা শিউরে ওঠে। কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তোমার যৌবনের সেই হাজার হাজার ঘণ্টা তুমি কোন কাজে ব্যয় করেছ? তখন কি আমরা উত্তর দিতে পারব যে, হে আল্লাহ! আমি ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করে, রিলস দেখে আর কমেন্ট বক্সে মানুষের সাথে তর্ক করে আমার যৌবন পার করেছি?

এই ডিজিটাল শৃঙ্খল আমাদের এতটাই অন্ধ করে দিয়েছে যে, আমরা এই নিশ্চিত জবাবদিহিতার কথা সম্পূর্ণ ভুলে ব্যাকুল হয়ে লাইক আর ভিউয়ের হিসাব মিলাচ্ছি।

 

শৃঙ্খল ভাঙার গান

 

ফারহান সেদিন রাতে এক চরম অপরাধবোধে ভুগল। সে দিনশেষে হিসাব করে দেখল, আজ সে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করেছে। অথচ তার পড়ার টেবিলের কাজগুলো সব পড়ে আছে, মায়ের সাথে দুটো ভালো কথা বলা হয়নি, এমনকি মাগরিব আর এশার নামাজটাও সে পড়েছে একেবারে শেষ ওয়াক্তে, অতি দ্রুততার সাথে।

সে বুঝতে পারল, এই অদৃশ্য শৃঙ্খল যদি সে আজ না ভাঙে, তবে আগামী দিনে সে একজন ব্যর্থ এবং অলস মানুষে পরিণত হবে। তার ঈমান, তার চরিত্র, তার ভবিষ্যৎসবকিছু এই স্ক্রিনের ভেতরে সমাহিত হয়ে যাবে।

সে একটা শক্ত সিদ্ধান্ত নিল। প্রথমত, সে তার ফোন থেকে অপ্রয়োজনীয় সব সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপসের নোটিফিকেশন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিল। দ্বিতীয়ত, সে প্রতিজ্ঞা করল, পড়ার টেবিলে বসার সময় ফোনটা অন্য ঘরে রেখে আসবে।

শুরুর কয়েকদিন তার খুব কষ্ট হচ্ছিল, হাতটা বারবার পকেটের দিকে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু সে যখনই অস্থির অনুভব করত, তখনই আউজু বিল্লাহ পড়ে কোরআনের একটি আয়াত বা কোনো দ্বীনি বই পড়া শুরু করত।

কয়েক সপ্তাহ পর ফারহান এক অভূতপূর্ব স্বাধীনতা অনুভব করল। সে দেখল, এখন তার হাতে প্রচুর সময়। সে সময়মতো পড়াশোনা শেষ করতে পারছে, পরিবারকে সময় দিতে পারছে এবং সবচেয়ে বড় কথানামাজে এখন সে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্থিরতা ও মনের প্রশান্তি খুঁজে পাচ্ছে।

ডিজিটাল দুনিয়ার অদৃশ্য শৃঙ্খল ভেঙে বাস্তব জীবনের আলোয় ফিরে আসার আনন্দ যে কতটা মধুর, ফারহান আজ তা মন থেকে উপলব্ধি করতে পারল।

 

অধ্যায় ৪

 

যখন তাহাজ্জুদ হারিয়ে গেল

 

রাত আড়াইটা। পুরো মহল্লা এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝে মাঝে কেবল দূর থেকে দু-একটা নৈশপ্রহরীর বাঁশির আওয়াজ ভেসে আসে। এই সময়ে আকাশের ওপর থেকে এক বিশেষ রহমত ও বরকত বর্ষিত হয় পৃথিবীর বুকে

তাহসিনের ঘরের পরিবেশটাও শান্ত, কিন্তু তার বিছানায় কোনো প্রশান্তি নেই। সে তার ঘরের অন্ধকার কোণে শুয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফোনের স্ক্রিনের দিকে। ইউটিউবের একটা টেক-রিভিউ শেষ করে সে এখন এক্স (টুইটার)-এর ট্রেন্ডিং পেজে স্ক্রল করছে। রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি, বিনোদন জগতের গসিপ আর আন্তর্জাতিক খবরের এক বিশাল মেলা বসেছে তার চোখের সামনে

তাহসিন একসময় এমন ছিল না। মাত্র এক বছর আগের কথাও যদি ধরা যায়, তাহসিনের রাতগুলো ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। সে ছিল এমন এক তরুণ, যার দিন শুরু হতো আল্লাহর স্মরণে আর রাত শেষ হতো জায়নামাজে চোখের পানিতে। রাত দুইটা বা আড়াইটা বাজলেই তার ভেতরের এক অদৃশ্য তাগিদ তাকে জাগিয়ে তুলত। সে পরম আগ্রহে ওজু করে মেসওয়াক করে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যেত

সেই নিঝুম রাতে যখন সে সিজদায় গিয়ে বলতসুবহানা রাব্বিয়াল আলা (মহাউন্নত আমার রবের পবিত্রতা ঘোষণা করছি), তখন তার মনে হতো দুনিয়ার সমস্ত ক্লান্তি, বিষণ্ণতা আর দুশ্চিন্তা এক নিমেষে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে। তাহাজ্জুদের সেই নিঃশব্দ কান্নাগুলো ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। নামাজের পর যখন সে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহের ক্ষমা চাইত, তখন তার অন্তরে যে স্বর্গীয় শান্তি অনুভূত হতো, তা দুনিয়ার কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা চলে না

কিন্তু আজ? আজ সেই তাহসিনের চোখজোড়া লাল হয়ে আছে স্ক্রিনের নীল আলোয়। সে ক্লান্তি অনুভব করছে, তার চোখ ভেঙে ঘুম আসছে, তবুও সে ফোনটা রেখে চোখ বন্ধ করতে পারছে না। একটা অদ্ভুত, অদৃশ্য মোহ তাকে টেনে রাখছে ভার্চুয়াল জগতের অলীক কোলাহলে

 

রহমতের রাতের ডিজিটাল অবক্ষয়

 

মাঝরাতের এই সময়টুকুকে ইসলামে এক বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এটি এমন এক সময় যখন বান্দা ও আল্লাহর মাঝখানে কোনো পর্দা থাকে না

রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

আমাদের মহান রব প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং ঘোষণা করতে থাকেনকে আছ, যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছ, যে আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দান করব? কে আছ, যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব? (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৫)

মহাবিশ্বের প্রতিপালক যখন প্রতি রাতে দুনিয়ার আকাশে এসে বান্দাকে ডাকতে থাকেন, তখন আমরা আমাদের তরুণ সমাজের এক বিরাট অংশকে আবিষ্কার করি স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকতে। যে হাত দুটো ওঠার কথা ছিল আল্লাহর দরবারে দোয়ার জন্য, সেই হাতগুলো ব্যস্ত থাকে ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে অর্থহীন তর্কে। যে চোখ দুটো থেকে অশ্রু ঝরার কথা ছিল নিজের গুনাহের অনুশোচনায়, সেই চোখগুলো মগ্ন থাকে ইনস্টাগ্রামের রিলস বা টিকটকের সস্তা বিনোদনে

তাহসিন একসময় এই হাদিসটি পড়ে কেঁদেছিল। আর আজ সে নিজেই এই আধুনিক ফিতনার শিকার। রাত জেগে স্ক্রলিং করতে করতে যখন ঘড়ির কাঁটা চারটা ছুঁইছুঁই করে, তখন সে ক্লান্ত হয়ে ফোনটা বালিশের পাশে রেখে দেয়। চোখের পাতায় তখন এক তীব্র অবসাদ। সে যখন চোখ বন্ধ করে, তখন তার মাথায় ঘুরপাক খায় শেষ দেখা ভিডিওর মিউজিক কিংবা কোনো চ্যাটের রিপ্লাই

ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়ফজরের আযান যখন হয়, তাহসিন তখন গভীর ঘুমে অচেতন। যে তরুণ একসময় তাহাজ্জুদ ছাড়ত না, আজ সে ফরজ ফজর নামাজটাও হারিয়ে ফেলছে অলসতার বিছানায়

 

ইবাদতের স্বাদ হরণ

 

তাহসিন ইদানীং একটা বিষয় খুব তীব্রভাবে লক্ষ্য করছে। সে যখন অনেক কষ্ট করে দিনশেষে বা পরের দিন জোহরের নামাজে দাঁড়ায়, সে নামাজের মধ্যে কোনো খুশু-খুজু বা একাগ্রতা খুঁজে পায় না। নামাজে দাঁড়িয়েই তার মনে পড়ে যায় ফেসবুকে দেখা কোনো মিম কিংবা ইউটিউবের কোনো থাম্বনেইল। তার অন্তরটা যেন এক শুষ্ক মরুভূমি হয়ে গেছে, যেখানে ইবাদতের কোনো ভিজা অনুভূতি নেই

আসলে, রাতের আধারে করা গুনাহ এবং অর্থহীন কাজ মানুষের অন্তরের ইবাদতের স্বাদ সম্পূর্ণ কেড়ে নেয়। বিখ্যাত তাবেয়ি সুফিয়ান সাওরি (রহ.) একবার বলেছিলেন:

আমি একটি মাত্র গুনাহ করার কারণে দীর্ঘ পাঁচ মাস তাহাজ্জুদের নামাজ থেকে বঞ্চিত ছিলাম।

একটি মাত্র গুনাহের কারণে যদি একজন মহান আলেম পাঁচ মাস তাহাজ্জুদ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, তবে আমরা যারা রাতের পর রাত হাজারো অনাবশ্যক ও নিষিদ্ধ জিনিস স্ক্রিনের পর্দায় দেখে পার করছি, আমাদের অবস্থা কেমন হবে? আমাদের অন্তর থেকে যে তাহাজ্জুদের নূর, কোরআনের প্রতি ভালোবাসা এবং নামাজের স্বাদ হারিয়ে যাবেতাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার এই রাত জাগা সংস্কৃতি আমাদের অজান্তেই আমাদের আত্মিক মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে

 

হারানো নূর ফিরিয়ে আনার লড়াই

 

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তাহসিনের মনটা খুব ভারী হয়ে গেল। আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে সে চমকে উঠল। চোখের নিচে কালো দাগ, চেহারার সেই চেনা উজ্জ্বলতা আর শান্ত ভাবটা উধাও। সবচেয়ে বড় কথা, তার অন্তরের ভেতর এক তীব্র হাহাকার ও শূন্যতা

সে তার ডায়েরিটা খুলল। এক বছর আগের ডায়েরির পাতায় লেখা ছিল তাহাজ্জুদের পর তার অনুভূতির কথাআজ সিজদায় গিয়ে মনে হলো আল্লাহ খুব কাছে আছেন। মনের সব কষ্ট হালকা হয়ে গেল।

লেখাটা পড়ে তাহসিনের চোখ ফেটে পানি চলে এলো। সে ভাবল, আমি কিসের বিনিময়ে কী হারালাম? কয়েকটা লাইক, কয়েকটা স্ক্রলিং আর অর্থহীন কিছু ভিডিওর জন্য আমি আমার রবের সাথে সেই একান্ত কথোপকথনের রাতগুলো বিক্রি করে দিলাম?

সেদিনই তাহসিন একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল। সে তার ডিজিটাল জীবনে এক কঠোর নিয়ম জারি করল। রাত দশটার পর সে তার ফোনটি বন্ধ করে পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দেবে এবং কোনো অবস্থাতেই বিছানায় ফোন নিয়ে যাবে না

প্রথম কয়েক রাত তার ঘুমাতে খুব কষ্ট হলো। মস্তিষ্ক বারবার ডোপামিনের সেই পুরনো আসক্তি খুঁজছিল। তাহসিন বিছানায় এপাশ-ওপাশ করল, কিন্তু সে হার মানল না। সে ফোনের বদলে হাত দিয়ে তসবীহ পড়তে শুরু করল, ইস্তিগফার পড়তে পড়তে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল

ঠিক এক সপ্তাহ পর, রাত তিনটায় তাহসিনের চোখটা নিজে থেকেই খুলে গেল। চারপাশ ঠিক আগের মতোই নিঝুম। তাহসিন বিছানা ছেড়ে উঠল। পরম শান্তিতে ওজু করল। ঠান্ডা পানি যখন তার মুখে স্পর্শ করল, তার মনে হলো তার ভেতরের দীর্ঘদিনের অলসতা ধুয়ে যাচ্ছে

সে জায়নামাজে দাঁড়াল। দীর্ঘ এক বছর পর সে আবার রাতের শেষ তৃতীয়াংশে রবের সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল। তার চোখের পানি যখন জায়নামাজকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল, তখন সে অনুভব করল, তার হারিয়ে যাওয়া সেই আত্মিক নূর আবার ফিরে আসছে। স্ক্রিনের কৃত্রিম আলোর চেয়ে জায়নামাজের এই অন্ধকারের আলো যে কত কোটি গুণ বেশি প্রশান্তিময়, তাহসিন তা আজ অশ্রুসিক্ত চোখে পুনরায় আবিষ্কার করল

 

অধ্যায় ৫

 

নিখুঁত জীবনের মিথ্যা ছবি

 

ছুটির দিনের দুপুর। নাবিলা তার শোবার ঘরের বিছানায় শুয়ে এক দৃষ্টিতে ফোনের স্ক্রিন দেখছে। বাইরে চমৎকার রোদ, কিন্তু নাবিলার মনের ভেতর এক মেঘলা আবহাওয়া। সে ইনস্টাগ্রামে তার কলেজের এক বান্ধবীর স্টোরি দেখছিল

বান্ধবীটি তার স্বামীর সাথে গুলশানের এক দামি রেস্তোরাঁয় বসে লাঞ্চ করছে। টেবিলজুড়ে থরে থরে সাজানো কন্টিনেন্টাল খাবার, পাশে রাখা নামী ব্র্যান্ডের নতুন হ্যান্ডব্যাগ। ছবির নিচে ক্যাপশন দেওয়াBlessed with the best! #HusbandGoals #FineDiningছবিতে বান্ধবীর মুখের চওড়া হাসি আর ত্বকের উজ্জ্বলতা দেখে নাবিলার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো

নাবিলা স্ক্রল করে আরও নিচে গেল। এবার আরেক পরিচিত আপুর পোস্ট ভেসে উঠল। তিনি সপরিবারে মালদ্বীপে ছুটি কাটাচ্ছেন। নীল সমুদ্রের ব্যাকগ্রাউন্ডে রিসোর্টের চমৎকার সব ছবি। এরপরের পোস্টে এক খালাতো বোন তার নতুন ফ্ল্যাটের ইন্টেরিয়র ডিজাইনের ছবি শেয়ার করেছে

নাবিলা নিজের চারপাশের ঘরটার দিকে তাকাল। দেয়ালের প্লাস্টারটা এক কোনায় কিছুটা চটে গেছে, পড়ার টেবিলটা অগোছালো, আর তার নিজের জীবনটা কত সাদামাটা, কত বৈচিত্র্যহীন! তার স্বামী একজন সাধারণ চাকরিজীবী, যে দিনরাত খাটুনি খেটে সংসার চালায়। তারা কতদিন এভাবে দামি রেস্তোরাঁয় যায় না, কত বছর ঢাকার বাইরে ঘুরতে যাওয়া হয় না!

হঠাৎ করেই নাবিলার মনে এক তীব্র হতাশা আর অসন্তোষ ভর করল। নিজের ভালো ও সুস্থ জীবনটাকে তার এক চরম ব্যর্থতা বলে মনে হতে লাগল। একটু পর যখন তার স্বামী অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরল, নাবিলা তার সাথে কোনো হাসিমুখে কথা বলল না। বরং একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে খিটখিটে মেজাজ দেখাল। সে মনে মনে ভাবতে লাগলসবার জীবন কত নিখুঁত, কত সুন্দর! শুধু আমার জীবনটাই এমন কষ্টের!

নাবিলা জানে না, সে আসলে সোশ্যাল মিডিয়ার তৈরি করা এক মস্ত বড় মরীচিকা ও মিথ্যা ছবির ফাঁদে পা দিয়েছে3

 

সোশ্যাল মিডিয়ার ফিল্টারড বাস্তবতা

 

আমরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় কারও প্রোফাইল বা স্টোরি দেখি, তখন আমরা আসলে তার পুরো জীবনটা দেখি না। আমরা দেখি তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে আনন্দময় এবং সবচেয়ে সাজানো মুহূর্তটিযা শত শত ছবির মধ্য থেকে বেছে, ফিল্টার বা এডিট করে পোস্ট করা হয়েছে

কেউ তার পারিবারিক কলহ, ঋণের বোঝা, চোখের পানি, কিংবা গভীর রাতের একাকীত্বের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে না। মানুষ সেখানে কেবল তার সাফল্য আর সুখ প্রদর্শন করতে পছন্দ করে

কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন একজন সাধারণ দর্শক অন্যের সেই এডিটেড বা সাজানো হাইলাইট রিল (Highlight Reel)-এর সাথে নিজের বাস্তব জীবনের বিহাইন্ড দ্য সিন (Behind the Scenes)-এর তুলনা করতে শুরু করে। অন্যের নিখুঁত জীবনের এই মিথ্যা ছবি আমাদের মনের ভেতর থেকে শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতাবোধ কেড়ে নেয় এবং হাসাদ বা হিংসা ও হতাশার জন্ম দেয়

ইসলাম আমাদের মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা সম্পর্কে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে তাকালে অন্তরে শান্তি থাকবে

তিনি বলেছেন:

তোমরা নিজেদের চেয়ে নিম্নস্তরের (অর্থ-সম্পদ ও পার্থিব দিক থেকে কম সুবিধাপ্রাপ্ত) লোকদের দিকে তাকাও এবং তোমাদের চেয়ে উচ্চস্তরের লোকদের দিকে তাকাও না। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে না করো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৬৩)

আজকের সোশ্যাল মিডিয়া এই হাদিসের ঠিক বিপরীত কাজটি আমাদের দিয়ে করাচ্ছে। আমরা যখনই অ্যাপসগুলো খুলি, আমাদের চোখ চলে যায় আমাদের চেয়ে ধনী, আমাদের চেয়ে বেশি জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপন করা মানুষদের দিকে। ফলে, আল্লাহ আমাদের যে সুস্থ শরীর, সুন্দর পরিবার এবং মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়েছেনসেই মহান নিয়ামতগুলোকে আমাদের কাছে খুব তুচ্ছ ও মূল্যহীন মনে হতে শুরু করে

 

অদৃশ্য হিংসা এবং কুদৃষ্টির (নজর) প্রভাব

 

নিখুঁত জীবনের এই মিথ্যা ছবি প্রদর্শন শুধু যে দর্শকের মনে হতাশা তৈরি করে তা নয়, বরং যে ব্যক্তি এগুলো পোস্ট করছে, তাকেও এক বড় বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। ইসলামে আইনুল হাসাদ বা কুদৃষ্টি এবং হিংসার প্রভাব একটি প্রমাণিত সত্য

যখন কেউ নিজের সুখী দাম্পত্য জীবন বা ধন-সম্পদের ছবি বারবার লোকসমক্ষে প্রদর্শন করে, তখন হাজারো বঞ্চিত মানুষের মনের দীর্ঘশ্বাস এবং হিংসা সেই ব্যক্তির জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে

রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

কুদৃষ্টি (নজর লাগা) একটি সত্য বিষয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৪০)

ভার্চুয়াল দুনিয়ায় যে সম্পর্কগুলোকে খুব পারফেক্ট মনে হয়, দেখা যায় বাস্তব জীবনে তারা চরম অশান্তিতে ভুগছে। অনেক দম্পতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভালোবাসার বন্যা বইয়ে দেওয়ার কিছুদিন পরেই বিচ্ছেদের ঘোষণা দেয়। কারণ, সেই কৃত্রিম প্রদর্শনীর আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক ফাঁপা বাস্তবতা, যা কুদৃষ্টি আর আন্তরিকতাহীনতার কারণে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়

 

মরীচিকা ভেঙে সত্যের আলোয়

 

নাবিলার এই মানসিক অবসাদ একসময় চরম আকার ধারণ করল। সে সারাদিন মনমরা হয়ে থাকত এবং ঘরের দৈনন্দিন কাজে কোনো আনন্দ পেত না

একদিন বিকেলে সে তার এক দ্বীনি আপুর বাসায় বেড়াতে গেল। সেই আপুর ঘরটি খুবই সাধারণ, কিন্তু পুরো ঘরে এক অদ্ভুত শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ। আপু পরম যতে্নে নাবিলাকে নাস্তা দিলেন এবং কথায় কথায় নাবিলার মন খারাপের কারণ জানতে চাইলেন

নাবিলা কেঁদে ফেলে তার মনের সব জমানো হতাশার কথা খুলে বলল। সে বলল কীভাবে অন্যের সুখ দেখে তার নিজের জীবনকে বিষাক্ত মনে হয়

আপু মৃদু হেসে নাবিলার হাত দুটো ধরলেন এবং বললেন, নাবিলা, তুমি স্ক্রিনে যা দেখছ, তা একটা ফ্রেমের ভেতরের গল্প। ফ্রেমের বাইরে প্রতিটি মানুষের জীবনে একেকটা যুদ্ধ আছে। যে বান্ধবীকে তুমি রেস্তোরাঁয় হাসতে দেখছ, তুমি কি জানো তার পারিবারিক শান্তি কতটুকু? যে মালদ্বীপে ঘুরছে, তার মনের ভেতরে কী শূন্যতা আছে, তা কি তুমি জানো? আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেছেনঅবশ্যই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে। দুনিয়াতে কোনো মানুষের জীবন সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়।

আপু নাবিলাকে সূরা আর-রহমানের একটি আয়াত মনে করিয়ে দিলেন:

অতএব, তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? (সূরা আর-রহমান, আয়াত: ১৩)

নাবিলার মনে হলো তার চোখের সামনে থেকে একটা কালো পর্দা সরে গেল। সে বুঝতে পারল, সে এক অলীক মরীচিকার পেছনে ছুটে নিজের হাতের অমৃতকে অবহেলা করছিল। তার স্বামী যে হালাল উপায়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জন করে তার মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছে, তারা যে সুস্থ আছে, শান্তিতে রাতে ঘুমাতে পারছেএটাই তো সবচেয়ে বড় নিয়ামত!

সেদিনই নাবিলা তার ফোন থেকে ইনস্টাগ্রাম অ্যাপটি আনইনস্টল করে দিল। সে অন্যের সাজানো জীবনের দিকে তাকানো বন্ধ করে নিজের জীবনের দিকে তাকাল। প্রতিদিন সকালে উঠে সে এখন আল্লাহর দেওয়া ৫টি নিয়ামতের তালিকা করে মনে মনে শুকরিয়া আদায় করে

স্ক্রিনের সেই নিখুঁত জীবনের মিথ্যা ছবি থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর নাবিলা তার চেনা ঘরে, তার সাধারণ জীবনে খুঁজে পেল এক স্বর্গীয় প্রশান্তিযা কোনো ফিল্টার বা লাইক দিয়ে কেনা সম্ভব নয়

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অধ্যায় ৬

 

ক্যামেরার সামনে মুসলিম, একাকী জীবনে অন্য মানুষ

 

বিকেলের নরম আলোয় রিয়া তার ঘরের বড় আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে হিজাবটা ঠিক করছে। গত পনেরো মিনিট ধরে সে নিখুঁতভাবে হিজাবের ভাজ মেলাচ্ছে, যাতে মুখের গড়নটা সুন্দর দেখায়। এরপর সে তার আলমারি থেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় আবায়াটি পরে নিল। চোখে হালকা সুরমা, আর গালে সামান্য টাচ-আপ

সে তার স্টাডি টেবিলটা সাজাল। সেখানে একটা কাঠের রেহেলের ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ খোলা রাখা, পাশে একটা সুদৃশ্য তসবীহ এবং একটা কফি মগ। ব্যাকগ্রাউন্ডে মৃদু আলো

রিয়া ফোনটা ট্রাইপডে সেট করে ভিডিও অন করল। সে অত্যন্ত নরম ও ভক্তিপূর্ণ কণ্ঠে বলতে শুরু করল, আসসালামু আলাইকুম প্রিয় দ্বীনি বোনেরা। আজ আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করব কীভাবে সকালের ব্যস্ততার মাঝেও কোরআনের সাথে সময় কাটানো যায়। আমাদের অন্তরকে শান্ত রাখতে আল্লাহর কালামের কোনো বিকল্প নেই...

মাত্র দেড় মিনিটের একটি রিলস। ভিডিও শেষ হতেই রিয়া দ্রুত এডিটিং অ্যাপে গিয়ে একটু সুফি ঘরানার ব্যাকগ্রাউন্ড নাসিদ যোগ করল এবং ক্যাপশনে লিখলConnecting my soul with Allah. #QuranVlog #ModestLife #IslamicReminder

ভিডিওটি পোস্ট করার পর রিয়ার মুখে এক আত্মতৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। কমেন্ট বক্সে শত শত মানুষ প্রশংসায় পঞ্চমুখমাশাআল্লাহ বোন, আপনাকে দেখলে দ্বীনের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়!, আপনার হিজাবের স্টাইলটা জাস্ট অসাধারণ!রিয়া এখন ভার্চুয়াল দুনিয়ায় একজন দ্বীনি ইনফ্লুয়েন্সার

কিন্তু ভিডিওর ওই দেড় মিনিট শেষ হওয়ার ঠিক পরের মুহূর্তের রিয়াকে তার ফলোয়াররা চেনে না। ক্যামেরাটা বন্ধ হতেই রিয়ার মুখের সেই স্নিগ্ধ ভাবটা এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল

সে কোরআন শরিফটি বন্ধ করে অবহেলায় টেবিলের এক কোণে সরিয়ে রাখল। আসলে আজ সারাদিনে সে এক পৃষ্ঠাও কোরআন তিলাওয়াত করেনি, কেবল ভিডিওর শটের জন্যই ওটা খোলা হয়েছিল। একটু পর যখন তার ছোট বোন ঘরে এসে তাকে একটা দরকারী কাজের কথা বলল, রিয়া প্রচণ্ড চড়া গলায় তাকে ধমক দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিল

ক্যামেরার সামনে যে মেয়েটি ধৈর্য এবং আখলাক নিয়ে কথা বলছিল, ক্যামেরার পেছনে সেই মানুষটিই একাকী জীবনে এক চরম অহংকারী, খিটখিটে এবং ইবাদতবিমুখ এক ভিন্ন ব্যক্তিত্ব

 

আধ্যাত্মিক কপটতা ও রিয়ার ফিতনা

 

ডিজিটাল যুগের অন্যতম বড় একটি ট্র্যাজেডি হলো, এটি আমাদের খুব সহজে দ্বীনদার সেজে থাকার সুযোগ করে দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা ইসলামিক উক্তি শেয়ার করা, হিজাব বা সুন্নতি পোশাক পরে ছবি দেওয়া কিংবা ইবাদতের মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করা এখন খুব সহজ। কিন্তু এই বাহ্যিক প্রদর্শনী অনেক সময় মানুষের ভেতরের আসল রূপটিকে আড়াল করে দেয়

ইসলামী পরিভাষায় একে বলা হয় রিয়া বা লোকদেখানো মানসিকতা, যা আধ্যাত্মিক কপটতার শামিল। যখন কোনো ইবাদত বা দ্বীনি কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয়ে মানুষের বাহবা, লাইক এবং প্রশংসার জন্য করা হয়, তখন তা আল্লাহর দরবারে কবুল তো হয়ই না, উল্টো তা বড় গুনাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়

রাসূলুল্লাহ এই লোকদেখানো মানসিকতার পরিণতি সম্পর্কে একটি ভয়ংকর হাদিস বর্ণনা করেছেন। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাদের দিয়ে জাহান্নামের আগুন প্রজ্বলিত করা হবে, তাদের মধ্যে একজন হবেন এমন একজন আলেম বা ক্বারী, যিনি মানুষকে দ্বীনের কথা শেখাতেন

হাদিসে এসেছে, আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে ডেকে তার দেওয়া নেয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করাবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এই নেয়ামত দিয়ে কী আমল করেছ?

সে বলবে, আমি জ্ঞান অর্জন করেছি, মানুষকে শিখিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কোরআন তিলাওয়াত করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি তো জ্ঞান অর্জন করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে আলেম বলে এবং কোরআন তিলাওয়াত করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে ক্বারী বলে। আর তা (দুনিয়াতে) বলা হয়ে গেছে। এরপর নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯০৫)

রিয়া যখন এই হাদিসটি প্রথম একটি বইয়ে পড়েছিল, তখন তার গা শিউরে উঠেছিল। সে নিজের জীবনের সাথে এর মিল খুঁজে পাচ্ছিল। সে সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্বীনের প্রচার করছে ঠিকই, কিন্তু তার মূল উদ্দেশ্য কি আল্লাহর সন্তুষ্টি, নাকি নোটিফিকেশনের সেই নীল লাইক আর কমেন্টের প্রশংসা?

 

একাকী জীবনের আসল মানুষ

 

মানুষের প্রকৃত চরিত্র সোশ্যাল মিডিয়ার পাবলিক টাইমলাইনে প্রকাশ পায় না; বরং তা প্রকাশ পায় যখন সে সম্পূর্ণ একা থাকে, যখন তাকে দেখার মতো কোনো ক্যামেরা বা কোনো মানুষ আশেপাশে থাকে না

বিখ্যাত সাহাবি আবু দারদা (রা.) বলতেন:

তোমরা একাকী জীবনের গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকো, কারণ যার সাক্ষী স্বয়ং আল্লাহ, তিনিই এর বিচারক।

রিয়া নিজেকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে বসল। সে একা থাকলে কী করে? যখন মাঝরাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তখন কি সে জায়নামাজে দাঁড়ায়? না, তখন সে তার গোপন আইডি থেকে সাধারণ মানুষদের প্রোফাইল ঘেঁটে হিংসা করে, গীবত করে, কিংবা এমন সব কন্টেন্ট দেখে যা একজন মুসলিম হিসেবে তার দেখা মোটেও উচিত নয়

তার ইবাদতের সমস্ত শক্তি, সমস্ত সাজগোজ কেবল ক্যামেরার ফ্রেমের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। এই দ্বৈত জীবন তাকে ভেতর থেকে একবারে খোকলা করে দিচ্ছে। সে মানুষের কাছে জান্নাতি নারীর রোল মডেল, অথচ আল্লাহর খাতায় হয়তো সে একজন কপট বা রিয়াকারী হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এই ভাবনাটুকুই রিয়ার অন্তরের ভেতর এক তীব্র ভয়ের সঞ্চার করল

 

 

ফ্রেমের বাইরে আত্মশুদ্ধি

 

একদিন এশার নামাজের পর রিয়া আর লাইট অন করল না। অন্ধকারের মাঝে জায়নামাজে বসে সে নিজের বিবেকের মুখোমুখি হলো। সে ভাবল, আমি কাকে ধোঁকা দিচ্ছি? দুনিয়ার লাখো মানুষকে ধোঁকা দেওয়া যায়, কিন্তু আল-আলিম (যিনি অন্তরের গোপন রহস্য জানেন), তাঁর চোখ থেকে আমি কীভাবে পালাব?

সে তার ফোনটা হাতে নিল। তার পেজে তখনো নতুন ভিডিওর ভিউ আর কমেন্টের বন্যা বইছে। রিয়া এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে সেই ভিডিওটি ডিলিট করে দিল। শুধু তাই নয়, সে সিদ্ধান্ত নিল আগামী এক মাস সে সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো দ্বীনি পোস্ট বা নিজের কোনো ছবি দেবে না। এই সময়টুকু সে ব্যয় করবে নিজের ভেতরের আমিটাকে সংশোধন করার জন্য

শুরুর দিকে তার খুব ছটফটানি লাগছিল। মনে হচ্ছিল, সে দ্বীনের বড় কোনো খিদমত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু সে বুঝতে পারল, নিজের আত্মশুদ্ধি না করে অন্যকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া এক মস্ত বড় আত্মপ্রবঞ্চনা

এই এক মাসে রিয়া ক্যামেরার ফ্রেম ছাড়া কোরআন পড়তে শিখল। এখন সে যখন তিলাওয়াত করে, তখন পাশে কোনো ফোন থাকে না, কোনো রিলস তৈরির তাড়া থাকে না। সে মন দিয়ে কোরআনের অর্থ বোঝে এবং নিজের ভুলগুলোর জন্য একা একা কাঁদে। ঘরের মানুষের সাথে তার আচরণে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন এলো। তার ছোট বোন একদিন অবাক হয়ে বলল, আপু, তুমি ইদানীং অনেক বদলে গেছ, আগের মতো রাগ করো না।

রিয়া মুচকি হাসল। সে বুঝতে পারল, ক্যামেরার সামনের মেকি মুসলিম হওয়ার চেয়ে, একাকী জীবনে আল্লাহর একজন সাধারণ ও খাঁটি বান্দা হওয়া অনেক বেশি শান্তির। মানুষের টাইমলাইনে লাইক পাওয়ার চেয়ে আল্লাহর আরশের নিচে একটুখানি কবুলিয়ত পাওয়াটাই যে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, রিয়া আজ তার একাকী জীবনের জায়নামাজে তা অশ্রুভেজা চোখে অনুধাবন করতে পারল

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অধ্যায় ৭

 

একটি হারাম ক্লিকের মূল্য

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার আর মাত্র দুদিন বাকি। সায়েম তার পড়ার টেবিলে বসে আছে। সামনে অ্যাকাউন্টিংয়ের এক বিশাল মোটা বই খোলা। মাথার ওপর সিলিং ফ্যানটা ঘুরছে, আর ঘরের এক কোণে হালকা আলো জ্বলছে। পড়ার মাঝখানে সায়েমের মাথাটা একটু জ্যাম হয়ে গেল। সে ভাবল, টানা দুই ঘণ্টা পড়া হলো, জাস্ট পাঁচ মিনিটের একটা ব্রেক নেওয়া দরকার।

সে টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিল। অভ্যাসবশত ফেসবুকের নোটিফিকেশন চেক করল, বন্ধুদের কয়েকটা মেসেজের রিপ্লাই দিল। এরপর যখন সে ফোনটা রেখে আবার বইয়ের দিকে মনোযোগ দিতে যাবে, ঠিক তখনই স্ক্রিনের নিচে একটা চটকদার স্পন্সরড বিজ্ঞাপন ভেসে উঠল

বিজ্ঞাপনের থাম্বনেইলটা বেশ উসকানিমূলক এবং ক্যাপশনে লেখাবাস্তবতার আড়ালের কিছু গোপন সত্য, যা কেউ আপনাকে বলবে না। লিংকে ক্লিক করে ভিডিওটি দেখুন।

সায়েমের ভেতরের কৌতূহলটা এক নিমেষে জেগে উঠল। তার মনের একটা অংশ বলল, না সায়েম, এটা কোনো ভালো সাইট নয়। লিংকে ক্লিক করিস না। কিন্তু অন্য অংশটি ফিসফিস করে বলল, আরে, জাস্ট একটা ক্লিকই তো! দেখে নিই কী আছে, তারপরই কেটে দিয়ে পড়তে বসব। কেউ তো আর দেখছে না!

মনের ভেতরের এই সামান্য দ্বিধাদ্বন্দ্বকে এক পাশে ঠেলে সায়েম স্ক্রিনে একটা আলতো ছোঁয়া দিল। একটা হারাম ক্লিক

লিংকটি তাকে নিয়ে গেল একটি পর্নোগ্রাফিক বা নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটে। সায়েমের হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। সে যে পাঁচ মিনিটের ব্রেক নিতে চেয়েছিল, সেই পাঁচ মিনিট কখন এক ঘণ্টায় রূপ নিল, সে টেরই পেল না। চোখের সেই ক্ষণস্থায়ী তৃপ্তি আর শয়তানের ফাঁদে পড়ে সে এক গভীর পঙ্কে তলিয়ে গেল

যখন তার ঘোর কাটল, তখন ঘরের চারপাশটা তার কাছে একবারে অচেনা আর বিষাক্ত মনে হতে লাগল। টেবিলের খোলা বইটা যেন তাকে উপহাস করছে। সায়েম এক তীব্র অপরাধবোধ, আত্মগ্লানি আর মানসিক যন্ত্রণায় ডুবে গেল। সে বুঝতেও পারেনি, এই একটা ছোট ক্লিক তার জীবনে কত বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে যাচ্ছে

 

আধুনিক ফিতনা এবং একটি ক্লিকের ফাঁদ

 

আজকের ডিজিটাল যুগে শয়তান মানুষের কাছে কোনো ভয়ংকর রূপ নিয়ে আসে না; বরং সে আসে একটি সুন্দর রঙের বোতাম, একটি চটকদার থাম্বনেইল কিংবা একটি সংক্ষিপ্ত লিংকের রূপ ধরে। আমাদের আঙুলের ডগায় এখন দুনিয়ার সমস্ত আলো যেমন মজুদ আছে, তেমনি এক ক্লিকের দূরত্বে অপেক্ষা করছে অন্ধকারের এক অতল গহ্বর

আমরা অনেকেই মনে করি, একটা ক্লিক করলে কী এমন ক্ষতি হবে? একটা ভিডিও বা একটা ছবি দেখলেই কি ঈমান চলে যায়?

কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়, শয়তান মানুষকে কখনোই একবারে বড় কোনো গুনাহে লিপ্ত করে না। সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে, সুনিপুণ পরিকল্পনায় মানুষকে ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই প্রক্রিয়াটিকে বলেছেন খুতুওয়াতিশ শয়তান বা শয়তানের পদচিহ্ন

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:

হে মুমিনগণ! তোমরা শয়তানের পদচিহ্ন অনুসরণ করো না। আর যে কেউ শয়তানের পদচিহ্ন অনুসরণ করবে, তবে শয়তান তো তাকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজেরই নির্দেশ দেবে। (সূরা আন-নূর, আয়াত: ২১)

সায়েমের সেই একটি মাত্র ক্লিক ছিল শয়তানের প্রথম পদচিহ্ন। যখন সে সেই নিষিদ্ধ জগতে প্রবেশ করল, তখন তার মন থেকে পড়াশোনার সমস্ত মনোযোগ উবে গেল। পরীক্ষার আগের এই মূল্যবান সময়টুকু, যা তার ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল, তা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল এক চরম মানসিক অশান্তির স্রোতে। চোখের এই গুনাহ মানুষের মেধা, স্মৃতিশক্তি এবং আত্মিক শক্তিকে একবারে চুরমার করে দেয়

 

একটি ভুলের চড়া মূল্য

 

হারাম ক্লিকের চড়া মূল্য সায়েমকে হাতেনাতে দিতে হলো। পরীক্ষার দিন সকালে সে যখন পরীক্ষার হলে বসল, তখন তার মাথা সম্পূর্ণ ফাঁপা লাগছিল। গত দুদিন ধরে সে পড়ার টেবিলে বসলেই সেই নিষিদ্ধ দৃশ্যগুলো আর অপরাধবোধ তার মনের পর্দায় ভেসে উঠছিল। সে কোনো প্রশ্নের উত্তর গুছিয়ে লিখতে পারল না। যে সাবজেক্টে তার এ প্লাস পাওয়ার কথা ছিল, সেটায় সে কোনোমতে পাস করল

কিন্তু ক্ষতিটা শুধু পড়াশোনার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকল না। সায়েম খেয়াল করল, সেই একটা ক্লিকের পর থেকে তার ফোনে অনবরত বিভিন্ন রকমের নোংরা ও পপ-আপ বিজ্ঞাপন আসতে শুরু করেছে। কারণ, ইন্টারনেট জগতের অ্যালগরিদমগুলো একবার কোনো ব্যবহারকারীর দুর্বলতা ধরে ফেললে, তাকে বারবার সেই একই ধরণের কন্টেন্ট পুশ করতে থাকে। সায়েমের ফোনটা, যা একসময় পড়াশোনা আর দ্বীনি আলোচনার মাধ্যম ছিল, তা এখন এক আধুনিক ফিতনার বাক্সে পরিণত হয়েছে

সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটল তার আধ্যাত্মিক জীবনে। সায়েমের অন্তর থেকে মোনাজাতের সেই নরম অনুভূতিটা হারিয়ে গেল। সে যখন নামাজে দাঁড়াত, সে আল্লাহর সামনে লজ্জিত বোধ করত। শয়তান তার মনে আরও একটি কুভাবনা ঢুকিয়ে দিলতুই তো একজন পাপী, তুই এত বড় গুনাহ করেছিস, তোর নামাজ আল্লাহ কেন কবুল করবেন? তোর আর ভালো হওয়ার দরকার নেই।

এইভাবে একটি মাত্র হারাম ক্লিক একজন তরুণকে পড়াশোনা, চরিত্র এবং শেষ পর্যন্ত তার রবের রহমত থেকেও দূরে সরিয়ে দেওয়ার এক মরণফাঁদ তৈরি করল

 

তাওবার দরজা এবং নতুন সূচনা

 

সায়েম বেশ কিছুদিন এই মানসিক নরকের মধ্যে বাস করল। সে নিজেকে একজন ব্যর্থ ও অপবিত্র মানুষ মনে করতে শুরু করেছিল

একদিন জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে খতিব সাহেবের একটি কথা তার কানে তীরের মতো বিঁধল। খতিব সাহেব বলছিলেন, হে যুবকেরা! তোমাদের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে করা কোনো ভুল যদি তোমাদের আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে দেয়, তবে মনে রেখোসেটা শয়তানের দ্বিতীয় চাল। আল্লাহ তোমাদের পাপের চেয়েও অনেক বড় দয়ালু।

খতিব সাহেব পবিত্র কোরআনের সূরা আজ-জুমারের সেই বিখ্যাত আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:

বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আজ-জুমার, আয়াত: ৫৩)

আয়াতটি শুনে মসজিদের এক কোণে বসে সায়েম ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার মনে হলো, আল্লাহ সরাসরি তাকেই এই কথা বলছেন। সে বুঝতে পারল, সে একটা ভুল ক্লিক করে শয়তানের ফাঁদে পা দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এখন তাওবার একটি ক্লিকের মাধ্যমে সে আবার আলোর পথে ফিরে আসতে পারে

নামাজ শেষ করে সায়েম ঘরে ফিরে এলো। সে প্রথমে তার ফোনের ব্রাউজিং হিস্ট্রি, ক্যাশ ডাটা সব ক্লিয়ার করল। যে সাইটগুলো তাকে বিভ্রান্ত করছিল, সেগুলোতে অ্যাড ব্লকার এবং পর্নোগ্রাফি ফিল্টার সেট করল

এরপর সে ওজু করে দুই রাকাত তাওবার নামাজে দাঁড়াল। সে সিজদায় গিয়ে আল্লাহর কাছে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল, হে আল্লাহ, আমার একটা অসতর্ক আঙুলের ছোঁয়া আমাকে অন্ধকারের অতলে নিয়ে গিয়েছিল। আপনি আমার সেই হারাম ক্লিকের গুনাহ ক্ষমা করুন এবং আমার অন্তরকে পবিত্র করে দিন।

সেদিন জায়নামাজ থেকে যখন সায়েম উঠল, তখন তার মনের সেই ভারী বোঝাটা হালকা হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারল, ডিজিটাল দুনিয়ায় একটি হারাম ক্লিকের মূল্য অনেক চড়া হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর দরবারে একটি খাঁটি তাওবার মূল্য তার চেয়েও কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী। সায়েম তার ফোনটা হাতে নিল, তবে এবার আর কোনো কৌতূহলের বশে নয়, বরং নিজের দৃষ্টি আর ঈমানকে রক্ষা করার এক দৃঢ় সংকল্প নিয়ে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অধ্যায় ৮

 

কমেন্ট বক্সের যুদ্ধ

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুম কিংবা চায়ের দোকান নয়, যুদ্ধক্ষেত্রটি আসলে সাজ্জাদের পাঁচ ইঞ্চির স্মার্টফোন স্ক্রিন। ফেসবুকে একটি নিউজ পোর্টাল থেকে একটি সমসাময়িক জাতীয় ও ধর্মীয় বিষয়ে পোস্ট দেওয়া হয়েছে। সাজ্জাদ সেই পোস্টের নিচে একটি মন্তব্য পড়তে গিয়ে দেখল, অন্য একজন ব্যবহারকারীযার প্রোফাইল নাম আরিফ হাসান’—একটি ভিন্ন মত প্রকাশ করেছে

আরিফের যুক্তিটা সাজ্জাদের একদম পছন্দ হলো না। তার ভেতরের অহং আর রাগ এক মুহূর্তে চাঙ্গা হয়ে উঠল। সে কিবোর্ড চেপে দ্রুত টাইপ করল, আপনার মতো মূর্খরাই সমাজের আবর্জনা। না জেনে কথা বলতে লজ্জা করে না?

ব্যাস, শুরু হয়ে গেল এক অন্তহীন ভার্চুয়াল যুদ্ধ। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আরিফ পাল্টা কমেন্ট করল, নিজের চেহারা আয়নায় দেখেছেন? আপনার মতো ছাগলদের কমেন্ট করার সুযোগ দেওয়াই ভুল।

এবার সাজ্জাদের কান দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বের হতে লাগল। তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে, হাতের আঙুল কাঁপছে রাগে। সে আরিফের প্রোফাইলে ঢুকে তার ছবি, পড়াশোনা আর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করল, যাতে তাকে আক্রমণ করার মতো আরও ব্যক্তিগত কিছু রসদ পাওয়া যায়। সাজ্জাদ আর কোনো পড়াশোনা বা জরুরি কাজ করতে পারল না। পুরো বিকেল এবং সন্ধ্যা জুড়ে সে প্রতি তিন মিনিট পর পর নোটিফিকেশন চেক করতে লাগল এবং আরও ধারালো, আরও অপমানজনক ভাষা দিয়ে আরিফকে ঘায়েল করার চেষ্টা করতে লাগল

কমেন্ট বক্সের এই নোংরা যুদ্ধে সাজ্জাদের মন্তব্যটিতে আরও ১০-১২ জন লাইকহা হা রিঅ্যাক্ট দিয়ে তাকে উসকে দিল। সাজ্জাদ নিজেকে এক মস্ত বড় বিজয়ী ভাবল। কিন্তু সে টের পেল না, এই অনলাইন ঝগড়ার আড়ালে সে তার আমলনামার কী ভয়ংকর ক্ষতি করে ফেলেছে

 

ডিজিটাল গীবত, কুৎসা ও জিভের অপব্যবহার

 

বাস্তব জীবনে আমরা যখন কারও সাথে তর্ক করি, তখন সামনা-সামনি থাকার কারণে অন্তত কিছুটা হলেও সামাজিক ভদ্রতা বজায় রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্ট বক্স মানুষকে এক ছদ্মবেশী নিরাপত্তা দেয়। স্ক্রিনের ওপারে থাকা মানুষটিকে সরাসরি দেখতে না পাওয়ায় মানুষ খুব সহজে তার মুখের লাগাম হারিয়ে ফেলে। যে ভাষা বাস্তব জীবনে মুখে আনা অসম্ভব, কমেন্ট বক্সে মানুষ তা খুব অবলীলায় টাইপ করে দেয়

ইসলাম আমাদের মুখের এবং কথার ব্যবহারের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। হোক তা মুখে বলা কথা, কিংবা কিবোর্ডে টাইপ করা কোনো শব্দ

রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিব (মুখ) এবং হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০)

আমরা যখন কমেন্ট বক্সে কাউকে মূর্খ, ভণ্ড, পশু বা আরও নোংরা গালি দিয়ে আক্রমণ করি, তখন কি অপর মুসলিমটি আমাদের হাত ও মুখ থেকে নিরাপদ থাকল? অথচ আমরা ভাবি, অনলাইনে একটা কমেন্টই তো করেছি, এটা আর এমন কী বড় গুনাহ!

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, কমেন্ট বক্সে কোনো মানুষের নামে মিথ্যা রটানো বা তার অনুপস্থিতিতে তাকে নিয়ে উপহাস করা গীবত এবং নামিমাহ (চোগলখোরি)-র অন্তর্ভুক্ত। আমরা অবলীলায় অন্যের পোস্টের নিচে গীবতের চাষ করে যাচ্ছি

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই মানসিকতাকে তীব্রভাবে নিন্দা করেছেন:

ধ্বংস তাদের জন্য, যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে মানুষের নিন্দা ও দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ায়। (সূরা আল-হুমাযাহ, আয়াত: ১)

কমেন্ট বক্সের এই যুদ্ধগুলো আসলে শয়তানের এক চমৎকার ফাঁদ। সে আমাদের ইগো বা অহংকারকে উসকে দেয়, আর আমরা নিজেদের সঠিক প্রমাণ করার উন্মাদনায় লিপ্ত হয়ে গীবত, কুৎসা আর অপমানের পাহাড় গড়ে তুলি

 

নেক আমল হারানোর দেউলিয়া হিসাব

 

সাজ্জাদ রাতের বেলা যখন ঘুমাতে গেল, তখনো তার মাথাটা ব্যথায় ঝিমঝিম করছে। আরিফের শেষ কমেন্টটা ছিল একবারে সরাসরি তার পরিবারকে নিয়ে। সাজ্জাদ রাগে বিছানায় ছটফট করছে। সে ভাবল, কাল সকালে উঠে এর একটা চূড়ান্ত জবাব দিতে হবে

সেদিন রাতে সাজ্জাদ এশার নামাজে কোনো মনোযোগ পেল না। রবের সামনে দাঁড়িয়েও তার মনে ভেসে উঠছিল কিবোর্ডের সেই শব্দগুলো

সাজ্জাদ ভুলে গেছে রাসূলুল্লাহ -এর সেই বিখ্যাত মুফলিস বা দেউলিয়া মানুষের হাদিসটি। রাসূলুল্লাহ একবার সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমরা কি জানো দেউলিয়া কে?

সাহাবিগণ উত্তর দিলেন, যার টাকা-পয়সা বা ধন-সম্পদ নেই, সেই তো দেউলিয়া।

তখন রাসূলুল্লাহ বললেন:

আমার উম্মতের মধ্যে আসল দেউলিয়া হলো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু সে দুনিয়াতে কাউকে গালি দিয়েছিল, কারও প্রতি অপবাদ আরোপ করেছিল, কারও মাল ভক্ষণ করেছিল, কারও রক্তপাত করেছিল এবং কাউকে প্রহার করেছিল। অতঃপর (বিচারের মাঠে) তার নেক আমল থেকে এদেরকে (হকদারদের) দিয়ে দেওয়া হবে। যদি তার নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তবে পাওনাদারদের গুনাহগুলো এনে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮১)

সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্ট বক্সে আমরা প্রতিদিন যে হাজার হাজার অচেনা মানুষকে গালি দিচ্ছি, উপহাস করছিকিয়ামতের দিন তারা প্রত্যেকে আল্লাহর দরবারে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবে। তখন আমাদের সাধনার নামাজ, রোজা আর তিলাওয়াতের নেক আমলগুলো চলে যাবে সেই আরিফ বা অচেনা প্রোফাইলের মালিকদের অ্যাকাউন্টে। আমরা শুধু একটা কমেন্ট করার কারণে কিয়ামতের দিন এক চরম দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি হবো

 

কিবোর্ডের লাগাম ও অন্তরের শান্তি

 

পরদিন সকালে সাজ্জাদের এক দ্বীনি বড় ভাই তার হলের রুমে এলেন। সাজ্জাদের মলিন মুখ আর ফোনের দিকে তার তীব্র মনোযোগ দেখে ভাইটি জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার সাজ্জাদ? তোমাকে এত অশান্ত লাগছে কেন?

সাজ্জাদ ক্ষোভ চেপে রাখতে না পেরে কমেন্ট বক্সের পুরো স্ক্রিনশট ভাইটিকে দেখাল। সে বলল, দেখেন ভাই, এই লোকটা কীভাবে আমাকে আর আমার চিন্তাভাবনাকে অপমান করেছে! আমি কি এর একটা উচিত শিক্ষা দেব না?

বড় ভাইটি স্ক্রিনশটগুলো দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি শান্ত গলায় বললেন, সাজ্জাদ, তুমি এই লোকটাকে দালিলিক যুক্তি দিয়ে হারাতে পারবে না, কারণ সে এখানে সত্য জানতে আসেনি, এসেছে জিততে। আর তুমিও তার ফাঁদে পা দিয়ে নিজের ভেতরের প্রশান্তি আর আমলনামা ধ্বংস করছ। আল্লাহর রাসূল আমাদের কী শিখিয়েছেন মনে আছে?

তিনি সাজ্জাদকে একটি সুসংবাদবাহী হাদিস শোনালেন:

যে ব্যক্তি অন্যায় ও অনভিপ্রেত ঝগড়া পরিহার করে, অথচ সে সত্যের ওপর রয়েছেআমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি প্রাসাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি। (সূনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮০০)

কথাটি সাজ্জাদের বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে বুঝতে পারল, কমেন্ট বক্সে নিজেকে বড় প্রমাণ করার চেয়ে জান্নাতের সেই প্রাসাদের মূল্য অনেক বেশি। সে অন্যের কুৎসিত মন্তব্যের জবাব দিয়ে নিজের মুখ ও অন্তরকে অপবিত্র করতে চায় না

সাজ্জাদ তার ফোনটি হাতে নিল। আরিফের কমেন্টের আর কোনো রিপ্লাই সে দিল না। বরং সে আরিফের আইডিটি ব্লক করে দিল এবং পুরো থ্রেড থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। এরপর সে ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করে বুক ভরে একটা লম্বা শ্বাস নিল

বহুদিন পর সাজ্জাদ অনুভব করল, কমেন্ট বক্সের সেই কাল্পনিক যুদ্ধ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর তার অন্তরের ভেতর এক অদ্ভুত, স্নিগ্ধ ও স্বর্গীয় শান্তি নেমে এসেছে। সে বুঝতে পারল, কিবোর্ডের লাগাম টেনে ধরাই হলো ডিজিটাল যুগের প্রকৃত বীরত্ব

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অধ্যায় ৯

 

যে পোস্টটি জীবন বদলে দিল

 

মেহেদীর জীবনটা কাটছিল এক ভীষণ উদ্দেশ্যহীন স্রোতে। বয়স চব্বিশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে একটা বেসরকারি সংস্থায় ইন্টার্নশিপ করছে। প্রতিদিনের রুটিনটা ছিল বড্ড একঘেয়েসকালে তাড়াহুড়ো করে অফিস যাওয়া, ডেস্কে বসে ফাইলের কাজ করা, আর সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফেরা

বাড়ি ফেরার পর শুরু হতো তার জীবনের আসল অধ্যায়। বিছানায় শুয়ে রাত দুটো-তিনটা পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় অর্থহীন স্ক্রলিং। ফেসবুকের নিউজফিডে পলিটিক্যাল ট্রোল, ইউটিউবে মুভি রিভিউ, আর ইনস্টাগ্রামে চেনা-অচেনা মানুষের বিলাসী জীবনের ছবি দেখতে দেখতে সে এক অদ্ভুত একাকীত্ব ও হীনম্মন্যতায় ভুগত। মাঝে মাঝে তার মনে প্রশ্ন জাগতআমি আসলে কী করছি? আমার জীবনের গন্তব্য কোথায়? কিন্তু স্ক্রিনের পরের কন্টেন্টটি দেখার তীব্র আকর্ষণে সেই আত্মোপলব্ধির প্রশ্নগুলো প্রতি রাতেই চাপা পড়ে যেত

সেদিনও রাত তখন পৌনে একটা। মেহেদী ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ একটা সাধারণ ফেসবুক পেজের পোস্টের সামনে এসে থমকে গেল। কোনো চটকদার ছবি নেই, কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নেই; শুধু সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে কালো অক্ষরে কিছু কথা লেখা

পোস্টের শিরোনাম ছিলআজ রাতে যদি আপনার জীবনের শেষ স্ক্রলিং হয়?

মেহেদী সাধারণত দীর্ঘ লেখা পড়তে পছন্দ করে না, কিন্তু এই শিরোনামটি তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে কৌতূহল ধরে রাখতে না পেরে See More বোতামে চাপ দিল

 

আল-কোরআনের সেই অমোঘ বার্তা

 

পোস্টের ভেতরে একটি কোরআনের আয়াতের সহজ ও হৃদয়স্পর্শী ব্যাখ্যা দেওয়া ছিল। আয়াতটি ছিল সূরা আল-আম্বিয়ার প্রথম আয়াত:

মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনিয়ে এসেছে, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১)

পোস্টের লেখক লিখেছেন:

প্রিয় ভাই ও বোন, আমরা যখন বুড়ো আঙুল দিয়ে স্ক্রিনটা ওপর-নিচ করছি, তখন আমাদের অজান্তেই আমাদের জীবনের শেষ পাতাগুলো উল্টে যাচ্ছে। মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত আজরাইল (আ.) হয়তো আপনার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, আর আপনি তখন ফোনের স্ক্রিনে কোনো হারাম দৃশ্য বা অর্থহীন বিনোদনে মগ্ন। আপনি কি চান আপনার মৃত্যুর ঠিক আগের শেষ আমলটি হোক একটি অর্থহীন ফেসবুক স্ক্রলিং? আপনি কি চান আপনার রবের সামনে এই অবস্থায় দাঁড়াতে?

লেখাটি পড়তে পড়তে মেহেদীর গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। ঘরের এসিটা চালু থাকার পরও তার কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়ল। সে বিছানায় উঠে বসল

সোশ্যাল মিডিয়া তাকে এতদিন শুধু বিনোদন আর হাসির উপাদান দিয়েছে, কিন্তু আজকের এই একটি পোস্ট তাকে সরাসরি এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলযার নাম মৃত্যু। সে তার নিজের জীবনের দিকে তাকাল। গত কয়েক বছরে সে কত হাজার ঘণ্টা এই স্ক্রিনের পেছনে নষ্ট করেছে! কত ওয়াক্ত নামাজ অলসতার কারণে কাযা করেছে! তার মনে হলো, আল্লাহ যেন এই পোস্টটির মাধ্যমে সরাসরি তাকেই সতর্ক করছেন

 

 

 

 

প্রযুক্তির ইতিবাচক দিক: দাওয়াহর এক আধুনিক মাধ্যম

 

সোশ্যাল মিডিয়াকে আমরা সাধারণত ফিতনা, আসক্তি আর গুনাহের উৎস হিসেবেই দেখি। কিন্তু মুদ্রার ওপিঠে এর একটি চমৎকার ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এই ডিজিটাল দুনিয়া যেমন মানুষকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে, তেমনি এটি আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক অনন্য সেতুও হতে পারে

রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

যে ব্যক্তি কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সে তার অনুসারীদের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, অথচ তাদের সওয়াবের কোনো কমতি হবে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৭৪)

সোশ্যাল মিডিয়ার একটি ভালো পোস্ট, একটি ছোট ইসলামিক রিমাইন্ডার বা একটি সহিহ হাদিসের ইমেজ একজন বিভ্রান্ত যুবকের হৃদয়ে পরিবর্তনের আলো জ্বেলে দিতে পারে। মেহেদীর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটল। যে আঙুলগুলো এতদিন গুনাহের দিকে ছুটছিল, সেই আঙুলগুলো আজ একটি খাঁটি দ্বীনি পোস্টের ছোঁয়ায় থমকে দাঁড়াল

মেহেদী সেই পোস্টের নিচে দেওয়া একটি সহিহ হাদিস পড়ল, যেখানে বলা হয়েছে

তোমরা পাঁচটি জিনিসকে তার বিপরীত পাঁচটি জিনিসের পূর্বে গণীমত মনে করো: তোমার যৌবনকে বার্ধক্যের পূর্বে, সুস্থতাকে অসুস্থতার পূর্বে, স্বচ্ছলতাকে দারিদ্র্যের পূর্বে, অবসরকে ব্যস্ততার পূর্বে এবং জীবনকে মৃত্যুর পূর্বে। (মুস্তাদরাক আলাস-সহিহাইন, হাদিস: ৭৮৪৬)

এই কথাগুলো মেহেদীর হৃদয়ের শক্ত বরফকে এক নিমেষে গলিয়ে দিল। তার মনে হলো, সে এতদিন এক অন্ধকার অন্ধকূপে বন্দি ছিল, আর এই পোস্টটি সেই কূপের মুখে এক ফালি আলো ছড়ালো

 

পরিবর্তন ও নতুন জীবনের ভোর

 

মেহেদী আর স্ক্রল করতে পারল না। সে ফোনটা বিছানায় উপুড় করে রেখে দিল। তার চোখ ফেটে পানি চলে এলো। দীর্ঘ কয়েক বছর পর সে অনুভব করল, তার অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয়েছে। সে নিজেকে প্রশ্ন করল, আমি যদি আজ রাতে মরে যাই, আমার এই ফেসবুক আইডি, আমার এই ফলোয়াররা কি আমাকে কবরের আযাব থেকে বাঁচাবে?

সে ওজু করার জন্য বাথরুমে গেল। ওজু করে এসে সে ঘরের লাইটটি জ্বালল। আলমারির ওপর ধুলো জমে থাকা কোরআন শরিফটি পেড়ে এনে পরম মমতায় বুকে জড়াল। সে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়াল

সেদিন মাঝরাতে মেহেদী সেজদায় গিয়ে শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে বলল, ইয়া রব! আমি এতদিন স্ক্রিনের ভার্চুয়াল মায়ায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। আপনার দেওয়া যৌবন আর সময়কে অপচয় করেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমাকে আপনার পথে কবুল করুন।

পরদিন সকালে যখন ফজরের আযান হলো, মেহেদী আর অলসতা করে শুয়ে থাকল না। সে তার বাবার সাথে মসজিদের দিকে রওনা হলো। ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া যখন তার চোখে-মুখে লাগল, তখন তার মনে হলো আজ থেকে তার জীবনের এক নতুন ভোর শুরু হলো

সে তার ফোনে একটি নতুন নিয়ম চালু করল। সে তার ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্ট এবং ফলোয়িং লিস্ট থেকে সমস্ত অনাবশ্যক, অশ্লীল ও নেতিবাচক পেজগুলোকে আনফলো করে দিল। তার বদলে সে চমৎকার কিছু দ্বীনি পেজ, নির্ভরযোগ্য আলেমদের প্রোফাইল এবং কোরআন-হাদিসের গ্রুপ যুক্ত করল। এখন সে যখনই ফোন খোলে, তার স্ক্রিনে ভেসে ওঠে আল্লাহর বাণী, যা তাকে প্রতি মুহূর্তে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়

একটি ছোট ভার্চুয়াল পোস্ট কীভাবে একজন মানুষের বাস্তব জীবনকে চিরতরে বদলে দিতে পারে, মেহেদী আজ তার নিজের জীবনের আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারল

 

 

 

অধ্যায় ১০

 

ভার্চুয়াল বন্ধু, বাস্তব একাকীত্ব

 

রাতের খাবার শেষ করে সিয়াম তার ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল। ঘরের বাতি নিভিয়ে সে বিছানায় হেলান দিয়ে বসল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে তার ফেসবুক প্রোফাইলের উজ্জ্বল স্ক্রিনটি তার মুখে এসে পড়েছে। সে তার প্রোফাইলের ফ্রেন্ডস অপশনে গিয়ে দেখল, সেখানে ৪,৮৫০ জন বন্ধু শোভা পাচ্ছে। আর তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত হাজার

সিয়াম তার ওয়ালে একটি নতুন স্ট্যাটাস দিলFeeling lonely in a crowded world. (জনাকীর্ণ পৃথিবীতে নিজেকে খুব একা লাগছে)

পোস্ট করার সাথে সাথেই নোটিফিকেশনের বন্যা বয়ে গেল। মাত্র দশ মিনিটে একশোর বেশি লাইক আর তিরিশটি কমেন্ট। কেউ লিখেছে, কী হয়েছে দোস্ত? ইনবক্সে আয়।, কেউ স্যাড রিঅ্যাক্ট দিয়েছে, আবার কেউ চটকদার কোনো মিম কমেন্ট করেছে। সিয়াম প্রতিটি কমেন্ট দেখল, কয়েকটার রিপ্লাইও দিল

কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, ফোনের স্ক্রিনে যত বেশি নোটিফিকেশন আসছিল, সিয়ামের ভেতরের একাকীত্ব আর শূন্যতা যেন তত বেশি ঘনীভূত হচ্ছিল। কমেন্ট বক্সে যারা আই অ্যাম হেয়ার ফর ইউ (আমি তোমার পাশে আছি) লিখছে, সিয়াম খুব ভালো করেই জানে, তাদের কেউ আসলে তার প্রকৃত বন্ধু নয়। তারা কেবল স্ক্রিনের ওপারে থাকা কিছু নাম আর ডিপি (ডিসপ্লে পিকচার)

রাত বাড়ার সাথে সাথে সিয়ামের বুকটা এক অজানা হাহাকারে ভারী হয়ে উঠল। ফ্রেন্ডলিস্টে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের মেলা, অথচ এই মুহূর্তে মনের ভেতরের আসল কষ্টটা খুলে বলার মতো একটা মানুষও তার পাশে নেই। সে এক তীব্র, দমবন্ধ করা বাস্তব একাকীত্বের শিকার

 

ডিজিটাল মরীচিকা ও ফাঁপা সম্পর্ক

 

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কানেক্টেড বা সংযুক্ত যুগ, অথচ একই সাথে এটি সবচেয়ে ডিসকানেক্টেড বা বিচ্ছিন্ন যুগ। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের হাজার মাইল দূরের মানুষের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের পাশের মানুষগুলোর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আমাদের ফ্রেন্ডলিস্ট বড় হচ্ছে, কিন্তু আমাদের হৃদয়ের পরিধি ছোট হয়ে আসছে

মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন হাইপার-কানেক্টিভিটি প্যারাডক্স (Hyper-connectivity Paradox)অর্থাৎ, মানুষ অনলাইনে যত বেশি মানুষের সাথে যুক্ত থাকে, বাস্তব জীবনে সে তত বেশি একা অনুভব করে। কারণ, সোশ্যাল মিডিয়ার সম্পর্কগুলো গড়ে ওঠে লাইক, কমেন্ট আর ইমোজির আদান-প্রদানের ওপর। এতে কোনো আন্তরিকতা, চোখের ভাষা কিংবা হৃদয়ের স্পর্শ থাকে না। এটি এক ধরনের ডিজিটাল মরীচিকা

ইসলাম আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরতা ও আন্তরিকতার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে। ইসলামে উখুওয়াত বা দ্বীনি ভ্রাতৃত্বের যে ধারণা দেওয়া হয়েছে, তা কোনো কৃত্রিম নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর প্রতিষ্ঠিত

রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সৌহার্দ্যের উদাহরণ একটি দেহের মতো। যখন দেহের কোনো একটি অঙ্গ অসুস্থ বা ব্যথায় আক্রান্ত হয়, তখন পুরো দেহটিই অনিদ্রা ও জ্বরে ভোগে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১১)

অনলাইনের ভার্চুয়াল বন্ধুরা এই হাদিসের সংজ্ঞায় পড়ে না। তারা আমাদের টাইমলাইনের হাসিমুখের ছবি দেখে বাহবা দিতে পারে, কিন্তু আমাদের বিপদের রাতে বা মনের গোপন ব্যথায় তাদের কোনো উপস্থিতি থাকে না। বাস্তব জীবনের জীবন্ত ও আন্তরিক সম্পর্কগুলোকে অবহেলা করে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বন্ধু খোঁজার এই প্রবণতাই তরুণ সমাজকে দিন দিন এক চরম মানসিক বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে

 

আল্লাহর সাথে সম্পর্কের শূন্যতা

 

সিয়াম বিছানায় শুয়ে ভাবল, কেন তার এই একাকীত্ব? সে তো সমাজবিচ্ছিন্ন কেউ নয়, তার তো অনেক পরিচিতি। আসলে মানুষের অন্তরের একাকীত্বের মূল কারণ বাহ্যিক মানুষের অভাব নয়, বরং অন্তরের মালিকের সাথে সম্পর্কের দূরত্ব

বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ইবনুল কায়্যিম (রহ.) একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন:

মানুষের অন্তরের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা ও একাকীত্ব রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও জিকির ছাড়া দুনিয়ার কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়। যদি পুরো দুনিয়াও তার পায়ের কাছে এনে দেওয়া হয়, তবুও তার অন্তরের সেই হাহাকার দূর হবে না।

আমরা যখন আমাদের একাকীত্ব দূর করার জন্য আল্লাহর জায়নামাজ ছেড়ে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের কমেন্ট বক্সে মানুষের মনোযোগ খুঁজি, তখন আমাদের শূন্যতা আরও বেড়ে যায়। মানুষ ক্ষণভঙ্গুর, তাদের মনোযোগও সাময়িক। আজ যে আপনার পোস্টে লাভ রিঅ্যাক্ট দিচ্ছে, কাল সে অন্য কারও ফিডে ব্যস্ত হয়ে যাবে। কিন্তু একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এমন এক সত্তা, যিনি বান্দার জন্য সবসময় অপেক্ষা করেন

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন:

যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই কেবল অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়। (সূরা আর-রা, আয়াত: ২৮)

সিয়াম এই আয়াতটি ভুলে গিয়েছিল। সে তার হৃদয়ের ক্ষত নিরাময়ের ওষুধ খুঁজছিল ভার্চুয়াল দুনিয়ার লাইকের ভেতর, অথচ আসল নিরাময় রয়ে গেছে আল্লাহর স্মরণে এবং তাঁর সাথে একান্তে কথোপকথনে

 

একাকীত্বের খাঁচা থেকে মুক্তির আলো

 

সেদিন মাঝরাতে সিয়াম তার জীবনের এক বড় সত্য উপলব্ধি করল। সে তার ফোনটি লক করে টেবিলের ওপর রেখে দিল। অন্ধকার ঘরে সে একা বসে রইল। কিন্তু এবার তার মনে কোনো ভয় বা হতাশা কাজ করল না। সে ওজু করতে গেল

ওজু শেষে সে জায়নামাজটি বিছিয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়াল। কোনো ক্যামেরা নেই, কোনো অডিয়েন্স নেই, কোনো ফলোয়ারের লাইক পাওয়ার তাড়া নেই। সিয়াম দুই রাকাত নামাজে দাঁড়িয়ে গেল। সে যখন রুকু আর সেজদায় গেল, তখন তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল

সে তার দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে বলল, হে আল্লাহ! আমি পাঁচ হাজার মানুষের ভিড়েও একা ছিলাম, কারণ আমি আপনার থেকে দূরে ছিলাম। আমি দুনিয়ার সস্তা মনোযোগের পেছনে ছুটে আমার অন্তরের শান্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। আপনি আমার অন্তরের এই শূন্যতা আপনার মহব্বত দিয়ে পূর্ণ করে দিন।

নামাজ শেষ করার পর সিয়াম এক অভূতপূর্ব হালকা ও শান্ত অনুভূতি অনুভব করল। তার মনে হলো, এতদিনের সেই দমবন্ধ করা একাকীত্ব এক নিমেষে উধাও হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারল, যার সাথে মহাবিশ্বের প্রতিপালকের সম্পর্ক জুড়ে যায়, সে কখনো একা হতে পারে না

পরদিন থেকে সিয়াম তার ভার্চুয়াল জীবনে বড় পরিবর্তন আনল। সে স্ক্রিনের পেছনে সময় দেওয়া কমিয়ে দিল এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোতে মনোযোগ দিল। সে তার মা-বাবার পাশে গিয়ে বসল, তাদের খোঁজখবর নিল। বন্ধুদের সাথে ভার্চুয়াল চ্যাটের বদলে বিকেলে মাঠে গিয়ে দেখা করতে শুরু করল

সবচেয়ে বড় কথা, সে প্রতিদিনের একটি নির্দিষ্ট সময় আল্লাহর সাথে একান্তে কাটানোর জন্য বরাদ্দ করলযেখানে কোনো ফোন থাকবে না, থাকবে শুধু সে আর তার রব। ভার্চুয়াল বন্ধুর অলীক মায়া ত্যাগ করে সিয়াম বাস্তব জীবনের সৌন্দর্য আর আল্লাহর দেওয়া প্রকৃত ভালোবাসার মাঝে খুঁজে পেল তার জীবনের আসল ঠিকানা

 

অধ্যায় ১১

 

স্ক্রিনের ওপারে কান্না

 

তানজিলার ঘরের দরজাটা সব সময়ই বন্ধ থাকে। দিন হোক কিংবা রাত, তার ঘরের জানালার ভারী পর্দাগুলো কখনো সরে না। ঘরের ভেতরে এক কৃত্রিম অন্ধকার, যা কেবল দূর করে তার আইফোনের স্ক্রিনের নীলচে আলো

বাইরের মানুষ তানজিলাকে চেনে এক অত্যন্ত সফল, প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি তরুণী হিসেবে। ফেসবুকে তার প্রতিটা ছবিতে শত শত কমেন্ট পড়েগর্জিয়াস!, বিউটি কুইন!, তোমার জীবনটা সত্যিই হিংসা করার মতো!গত সপ্তাহে সে তার নতুন দামি ব্র্যান্ডের পারফিউম আর এক বিলাসবহুল ক্যাফেতে কফি খাওয়ার ছবি পোস্ট করেছিল, যা দেখে তার পরিচিত মহলে হইচই পড়ে যায়

কিন্তু এই মুহূর্তে, সেই গ্ল্যামারাস স্ক্রিনের ওপারে বসে থাকা তানজিলার আসল রূপটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে ঘরের মেঝেতে হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তার চুলগুলো উসকোখুসকো, চোখ দুটো ফোলা আর লাল। পাশে পড়ে থাকা ফোনটায় এখনো অনবরত নোটিফিকেশনের টুংটাং শব্দ হচ্ছে, কিন্তু সেই শব্দগুলো এখন তার কানে তীরের মতো বিঁধছে

তানজিলা এক তীব্র মানসিক অবসাদ ও বিষণ্ণতার (Depression) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সে নিজেই জানে না কেন তার এই কান্না, কেন তার এই বুকফাটা হাহাকার। তার জীবনে জাগতিক সব উপাদানই আছেটাকা, সৌন্দর্য, পরিচিতি, গ্যাজেটস। তবুও প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর তার মনে হয়, বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। সে এক চরম শূন্যতা আর মানসিক নরকের বাসিন্দা

সোশ্যাল মিডিয়ার সেই হাজারো কৃত্রিম প্রশংসা তার অন্তরের এই গভীর ক্ষতকে এক বিন্দুও উপশম করতে পারছে না। সে এক আধুনিক ফিতনার ফাঁদে পড়ে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মিক শান্তি দুটোই হারিয়ে ফেলেছে

 

আধুনিক মানসিক ব্যাধি ও সোশ্যাল মিডিয়ার সংযোগ

 

বর্তমান যুগে বিষণ্ণতা, হতাশা, একাকীত্ব আর প্যানিক অ্যাটাকের (Panic Attack) মতো মানসিক সমস্যাগুলো মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির এক গভীর ও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে

আমরা যখন অনবরত স্ক্রল করি, আমাদের অবচেতন মন দুটো বড় বড় মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়:

১. তুলনা করার রোগ (Comparison Syndrome): অন্যের সাজানো সুখের সাথে নিজের দুঃখের তুলনা করা

২. হারিয়ে ফেলার ভয় (FOMO - Fear of Missing Out): মনে হওয়া যে সবাই কত এনজয় করছে, শুধু আমার জীবনটাই বৈচিত্র্যহীন

এই দুইয়ের সমন্বয়ে মানুষের মন থেকে রিল্যাক্সেশন বা স্থিরতা হারিয়ে যায়। মস্তিষ্ক অনবরত ডোপামিন আর কর্টিসল (ধকল সৃষ্টিকারী হরমোন)-এর ওঠানামার শিকার হয়, যা মানুষকে একসময় স্থায়ী বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দেয়

কিন্তু মানুষের এই আধুনিক মানসিক সংকটের আসল সমাধান কোথায়? ইসলাম একে মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিকউভয় দিক থেকে বিশ্লেষণ করেছে। মানুষের অন্তর কোনো যান্ত্রিক কাঠামো নয় যে একে কেবল বাহ্যিক বিনোদন বা ওষুধ দিয়ে সুস্থ করা যাবে। অন্তরের এক বিশেষ খাদ্য আছে, যা না পেলে সে ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে মরে যায়

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে সেই অমোঘ সত্যটি ঘোষণা করেছেন:

আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, নিশ্চয়ই তার জীবন হবে সংকীর্ণ ও কষ্টদায়ক। (সূরা ত্বাহা, আয়াত: ১২৪)

তানজিলা বাহ্যিকভাবে সুখী হলেও তার অন্তরে আল্লাহর স্মরণের কোনো স্থান ছিল না। সে তার জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট আর একাকীত্ব কাটাতে চেয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডে। ফলে, তার জীবনটা উপর দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ হলেও ভেতর থেকে একবারে সংকীর্ণ ও শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠেছিল

 

হতাশার আঁধারে আশার আলো

 

তানজিলা এক রাতে সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর চিন্তাও মাথায় নিয়ে এসেছিল। সে ভাবছিল, এই মেকি জীবন বয়ে বেড়ানোর চেয়ে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া অনেক ভালো। কান্না করতে করতে সে বিছানায় এলিয়ে পড়ল

ঠিক সেই সময় তার ফোনের স্ক্রিনে একটা মেসেজ পপ-আপ হলো। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দ্বীনি বান্ধবী, যে তানজিলাকে অনেকদিন ধরে খেয়াল করছিল, সে গভীর রাতে মেসেজ পাঠিয়েছে

তানজিলা, আমি জানি না তুমি এখন কীসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছ। তবে শুধু একটা কথা মনে করিয়ে দিতে এলাম, আমাদের রব আমাদের কখনো একা ছেড়ে দেন না। তুমি যা হারিয়েছ বা যে কষ্টের মধ্যে আছ, তা আল্লাহর চেয়ে ভালো কেউ বোঝে না। একবার ওনার দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখো না!

মেসেজটা পড়ে তানজিলার বুকের ভেতরের শক্ত পাথরটা যেন এক নিমেষে গলে গেল। সে বিছানায় উঠে বসল। বান্ধবীটি মেসেজের নিচে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত লিখে দিয়েছিল:

তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। (সূরা আজ-জুমার, আয়াত: ৫৩)

তানজিলা আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের মলিন চেহারা দেখে তার নিজেরই মায়া হলো। সে ভাবল, আমি কার পেছনে ছুটছিলাম? মানুষের প্রশংসার পেছনে? যে মানুষগুলো আমার জানাজা পড়ার পর পাঁচ মিনিটও আমার জন্য কাঁদবে না, তাদের একটা লাইকের জন্য আমি আমার জীবনটাকে শেষ করে দিচ্ছি?

 

 

রবের চরণে পরম প্রশান্তি

 

সেদিন মাঝরাতে তানজিলা জীবনের সবচেয়ে বড় ওজুটি করল। ঠান্ডা পানি যখন তার চোখে-মুখে আর মাথায় স্পর্শ করল, তার মনে হলো তার ভেতরের সমস্ত বিষাক্ত ক্লান্তি ধুয়ে যাচ্ছে। সে তার আলমারি থেকে একটি সাধারণ সুতি চাদর বের করে গা জড়িয়ে জায়নামাজে দাঁড়াল

সে যখন সেজদায় মাথা রাখল, তখন আর সে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তিল তিল করে জমে থাকা সমস্ত হতাশা, বিষণ্ণতা আর একাকীত্ব অশ্রু হয়ে ঝরে পড়তে লাগল জায়নামাজের বুকে। সে মুখে কোনো ভাষা উচ্চারণ করতে পারছিল না, শুধু ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। কিন্তু সে মনে মনে জানত, আল-বাসীর (যিনি সবকিছু দেখেন) এবং আস-সামিউ (যিনি সবকিছু শোনেন), তাঁর কাছে কোনো ভাষার প্রয়োজন নেই। তিনি বান্দার চোখের পানির প্রতিটা ফোঁটার ভাষা বোঝেন

রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় যখন সে সেজদারত অবস্থায় থাকে। অতএব, তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া করো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)

তানজিলা সেই রাতে দীর্ঘ সময় সেজদায় কাটাল। সে অনুভব করল, এক অদ্ভুত অলৌকিক হাত যেন তার হৃদয়ের সমস্ত ক্ষতকে মুছে দিচ্ছে। যে শান্তির খোঁজে সে হাজার হাজার ফলোয়ার আর লাইকের পেছনে হন্যে হয়ে ছুটেছিল, সেই মহামূল্যবান প্রশান্তি সে খুঁজে পেল এক নিভৃত রাতের নিঃশব্দ সেজদায়

পরদিন থেকে তানজিলা তার জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনল। সে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার দিনে মাত্র ৩০ মিনিটে নামিয়ে আনল। প্রতিদিন সকালে উঠে সে এখন প্রকৃতির দিকে তাকায়, আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে। সে নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং যেমন নিল, তেমনি তার চেয়ে বড় ওষুধ হিসেবে গ্রহণ করল প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও কোরআনের তিলাওয়াত

স্ক্রিনের ওপারে থাকা সেই কান্নার দিনগুলো পেছনে ফেলে তানজিলা আজ আল্লাহর রহমতের চাদরে আবৃত এক শান্ত, সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী মুসলিম নারী। সে বুঝতে পেরেছে, দুনিয়ার সব আলো নিভে গেলেও ঈমানের আলো আর রবের দরবার কখনো অন্ধকার হয় না

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অধ্যায় ১২

 

যে কোরআন অ্যাপটি সবকিছু বদলে দিল

 

ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র রাশেদের ল্যাপটপ আর ফোনের স্ক্রিনজুড়ে সবসময় থাকত কোডিং, নতুন সব সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট আর গ্যাজেটের রিভিউ। প্রযুক্তিপ্রেমী রাশেদ ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারত ল্যাপটপের সামনে। প্রযুক্তিকে সে দেখত মূলত বিনোদন, ক্যারিয়ার আর লাইফস্টাইল সহজ করার একটা মাধ্যম হিসেবে

কিন্তু রাশেদের এই প্রযুক্তিপ্রেমের একটা অন্ধকার দিকও ছিল। নতুন নতুন অ্যাপস টেস্ট করা, সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড নিয়ে মেতে থাকা এবং রাত জেগে টেক-ফোরামগুলোতে স্ক্রল করার কারণে তার ইবাদতের জীবনে চরম বিশৃঙ্খলা নেমে এসেছিল। টেবিলে বা তাকের ওপর রাখা পবিত্র কোরআন শরিফটির ওপর ধুলোর আস্তরণ পড়ে যেত, কিন্তু রাশেদের হাত চলে যেত মাউস আর কিবোর্ডের দিকে। সে মনে মনে ভাবত, কোরআন পড়ার তো সময় পাচ্ছি না, লাইফে এত ব্যস্ততা!

একদিন এক বৃষ্টির বিকেলে রাশেদ তার ফোনের প্লে-স্টোরে একটি নতুন অ্যাপ খুঁজছিল। হঠাৎ তার চোখের সামনে আল-কোরআন নামের একটি অ্যাপ ভেসে উঠল, যেটির রিভিউ এবং ইউজার ইন্টারফেস ছিল বেশ চমৎকার। কৌতূহলবশত রাশেদ অ্যাপটি ডাউনলোড করল। সে ভাবল, দেখিই না, অ্যাপটার ফিচারগুলো কেমন করেছে।

সেদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে রাশেদ বরাবরের মতো ফেসবুক খোলার পরিবর্তে অ্যাপটি চালু করল। স্ক্রিনে চমৎকার আরবি হরফে সূরা আল-কাহাফের আয়াতগুলো ভেসে উঠল, নিচে সাবলীল বাংলা অনুবাদ এবং প্রতিটি শব্দের অর্থ আলাদা করে সাজানো। পাশে অডিও অপশনে মক্কার একজন বিখ্যাত ক্বারীর সুললিত কণ্ঠের তিলাওয়াত

রাশেদ হেডফোনটা কানে গুঁজে অনুবাদে চোখ রাখল। মাত্র ১০ মিনিট শোনার কথা থাকলেও সে এক নাগাড়ে আধঘণ্টা পার করে দিল। তার মনে হলো, এত নিখুঁত, এত আকর্ষণীয় উপায়ে যে আল্লাহর বাণীকে নিজের হাতের মুঠোয় পাওয়া সম্ভব, তা সে আগে কখনো এভাবে ভাবেনি। এই একটি কোরআন অ্যাপ রাশেদের পুরো চিন্তাভাবনা এবং প্রযুক্তির ব্যবহারকে এক অভাবনীয় মোড় এনে দিল

 

প্রযুক্তি: আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত ও আমানত

 

আমরা অনেকেই প্রযুক্তি, ইন্টারনেট বা স্মার্টফোনকে কেবলই এক আধুনিক ফিতনা বা শয়তানের ফাঁদ মনে করে দূরে ঠেলে দিতে চাই। কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়, প্রযুক্তি নিজে ভালো বা মন্দ নয়; এটি একটি মাধ্যম মাত্র। এর ব্যবহারকারী যেভাবে একে ব্যবহার করবে, এটি তার জন্য ঠিক সেভাবেই ফল দেবে। স্মার্টফোন যেমন জাহান্নামের পথ সুগম করতে পারে, ঠিক তেমনি একে সঠিক উপায়ে ব্যবহার করে জান্নাতের পথও মসৃণ করা সম্ভব

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন:

আমি মানবজাতিকে এমন জ্ঞান দান করেছি যা সে জানত না। (সূরা আল-আলাক, আয়াত: ৫)

আজকের এই ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রযুক্তির এই অভাবনীয় বিকাশ আল্লাহরই দেওয়া এক বিশেষ জ্ঞান ও নেয়ামত। আমরা যদি এই নেয়ামতকে কেবল রিলস দেখা, গেম খেলা আর সময় নষ্টের পেছনে ব্যয় করি, তবে তা হবে নেয়ামতের চরম কুফরি বা অবহেলা। কিন্তু আমরা যদি আমাদের এই হাতের ডিভাইসটিকে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন এবং আল্লাহর বাণী প্রচারের মাধ্যম বানিয়ে নিই, তবে এটিই হবে আমাদের জন্য এক মহান সাদাকায়ে জারিয়া

রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অন্যকে তা শিক্ষা দেয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭)

রাশেদ চিন্তা করল, সে তো একজন টেক-পারসন। সে যদি এই প্রযুক্তিকে দ্বীনের খিদমতে, নিজের এবং অন্য যুবকদের আত্মশুদ্ধির কাজে লাগাতে পারে, তবে এর চেয়ে উত্তম কাজ আর কী হতে পারে!

 

ডিজিটাল স্ক্রিন যখন ইবাদতের মাধ্যম

 

সেই কোরআন অ্যাপটি রাশেদের রুটিন সম্পূর্ণ বদলে দিল। অ্যাপটিতে একটি বিশেষ ফিচার ছিল—‘ডেইলি নোটিফিকেশন রিমাইন্ডার। প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় স্ক্রিনে একটি করে কোরআনের আয়াত বা হাদিসের সুন্দর ডিজাইন করা নোটিফিকেশন ভেসে উঠত

রাশেদ আগে সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকের নোটিফিকেশন দেখত, আর এখন তার দিন শুরু হয় আল্লাহর একটি অমোঘ বাণী পড়ে। যেমন একদিন সকালে তার স্ক্রিনে ভেসে উঠল: হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহান রব সম্পর্কে ধোঁকায় ফেলে রাখল? (সূরা আল-ইনফিতার: ৬)আয়াতটি দেখামাত্রই রাশেদের অন্তরে এক তীব্র আত্মোপলব্ধির সৃষ্টি হলো

শুধু তিলাওয়াতই নয়, রাশেদ এবার অ্যাপের তাফসীর সেকশনটি ব্যবহার করে প্রতিদিন মাত্র একটি করে আয়াতের গভীর ব্যাখ্যা পড়তে শুরু করল। বাসে যাতায়াতের সময়, ক্লাসের ফাঁকে কিংবা জ্যামে বসে থাকার অলস মুহূর্তগুলোতে যেখানে সে আগে ইনস্টাগ্রামের ফিড স্ক্রল করত, এখন সেখানে সে ফোনের স্ক্রিনে কোরআনের অর্থ ও তাফসীর পড়ে

সে তার ফোনটিকে একটি ডিজিটাল দ্বীনি দুর্গে রূপান্তর করল। সে আরও কিছু অ্যাপ নামালযা দিয়ে সহিহ হাদিস পড়া যায়, দৈনিক দোয়ার মলাট দেখা যায় এবং নামাজের সঠিক ওয়াক্তের অ্যালার্ম পাওয়া যায়। প্রযুক্তি যে মানুষের আত্মিক উন্নতির এত বড় সহায়ক হতে পারে, রাশেদ তা হাতেনাতে প্রমাণ পেল

 

প্রযুক্তিকে দ্বীনের খেদমতে নিবেদন

 

রাশেদের পরিবর্তন শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না। তার ভেতরের কোডার ও ডেভেলপার সত্তাটি এবার দ্বীনের কল্যাণে জেগে উঠল। সে ভাবল, আমি যদি মানুষের জন্য চ্যাট অ্যাপ বা গেম বানাতে পারি, তবে কেন এমন কিছু করব না যা যুবসমাজকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনবে?

সে তার বন্ধুদের নিয়ে একটি ছোট টিম গঠন করল। তারা চমৎকার একটি ওপেন-সোর্স প্রজেক্ট হাতে নিলএকটি ইসলামিক প্রোডাক্টিভিটি অ্যাপ তৈরি করা। এই অ্যাপের কাজ হবে একজন তরুণকে তার দৈনিক সময়ের হিসাব রাখতে সাহায্য করা, সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি কমানোর জন্য স্ক্রিন-টাইম লক করে দেওয়া এবং প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর ছোট ছোট জিকিরের রিমাইন্ডার দেওয়া

তারা দিনরাত খাটুনি খেটে অ্যাপটি তৈরি করে প্লে-স্টোরে উন্মুক্ত করে দিল। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে হাজার হাজার তরুণ অ্যাপটি ডাউনলোড করল। অনেকেই রিভিউ সেকশনে লিখতে লাগলএই অ্যাপটি আমার সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি কমিয়ে নামাজে মনোযোগ ফেরাতে সাহায্য করেছে। আলহামদুলিল্লাহ!

রাশেদ ল্যাপটপের স্ক্রিনে সেই মন্তব্যগুলো পড়ছিল, আর তার চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। সে ভাবল, একসময় এই স্ক্রিনটিই ছিল তার সময় নষ্ট আর উদাসীনতার কারণ। আর আজ, আল্লাহর রহমতে, এই স্ক্রিন এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সওয়াবের জারিয়াহ হয়ে দাঁড়িয়েছে

সে বুঝতে পারল, স্ক্রিনের আলো দিয়ে যদি অন্তরের ঈমানের আলোকে জ্বালিয়ে রাখা যায়, তবে প্রযুক্তি অভিশাপ নয়, বরং পরকালের অনন্ত যাত্রায় জান্নাতের পথ দেখানোর এক অপূর্ব আলোকময় মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে

 

 

অধ্যায় ১৩

 

ইনফ্লুয়েন্সার থেকে দাঈ

 

ক্যাম্পাসের অডিটোরিয়ামে পা রাখতেই একদল তরুণ ফাহিমকে ছেঁকে ধরল। কেউ অটোগ্রাফ চাচ্ছে, কেউ সেলফি তোলার জন্য ফোন বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফাহিম হাসিমুখে পোজ দিচ্ছে। টিকটক আর ফেসবুক রিলসে তার ফলোয়ার সংখ্যা এখন প্রায় এক মিলিয়ন। লাইফস্টাইল ভ্লগিং, প্র্যাঙ্ক ভিডিও আর চটকদার ফ্যাশন ট্রেন্ড নিয়ে ভিডিও তৈরি করে সে রাতারাতি তরুণ সমাজের আইকন বনে গেছে

বাড়ি ফিরে ফাহিম যখন তার ইনবক্স খুলল, তখন দেখল নামী-দামী ব্র্যান্ডের স্পন্সরশিপের অফার, ফ্যানদের হাজারো মেসেজ। ফাহিমের জীবনটা তখন যেন এক ঝলমলে আলোর রাজ্য। সে যা-ই পোস্ট করে, তা-ই মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। এই সেলিব্রিটি তকমা আর খ্যাতির তীব্র নেশা তাকে এক কাল্পনিক অহংকারের চূড়ায় বসিয়ে দিয়েছিল। সে ভাবত, তার জীবনের চেয়ে সফল জীবন আর কার হতে পারে!

কিন্তু এই বাহ্যিক জাঁকজমকের আড়ালে ফাহিমের আসল জীবনটা ছিল চরম বিশৃঙ্খল। খ্যাতির পেছনে ছুটতে গিয়ে সে কখন যে নিজের নৈতিকতা, শালীনতা আর দ্বীনি মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে দিয়েছে, তা সে নিজেও টের পায়নি। ভিউ পাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে তাকে এমন সব সস্তা কৌতুক বা কন্টেন্ট তৈরি করতে হতো, যা একজন মুসলিমের চরিত্রের সাথে মোটেও খাপ খায় না। ভিডিও এডিটিং আর ফ্যানদের কমেন্টের রিপ্লাই দিতে দিতে তার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল, নিয়মিত কাযা হচ্ছিল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ

একদিন গভীর রাতে ফাহিম তার নিজের একটি পুরোনো ভিডিওর কমেন্ট সেকশন স্ক্রল করছিল। হঠাৎ একটি মন্তব্যের ওপর তার চোখ আটকে গেল। কোনো এক শুভাকাঙ্ক্ষী বড় ভাই লিখেছেন:

ফাহিম ভাই, আপনার ভিডিও দেখে লাখ লাখ তরুণ হাসছে, বিনোদন পাচ্ছে। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, আপনার এই মিলিয়ন ফলোয়ারের মধ্যে কতজন আপনার ভিডিও দেখে দ্বীন থেকে দূরে সরছে? কিয়ামতের দিন এই লাখ লাখ মানুষের বিভ্রান্তির দায়ভার কি আপনি নিতে পারবেন?

মন্তব্যটি ছোট, কিন্তু এর আঘাত ছিল প্রচণ্ড। ফাহিমের মনে হলো, কেউ যেন তাকে এক ঝটকায় তার কাঁচের প্রাসাদ থেকে মাটিতে আছড়ে ফেলেছে

 

খ্যাতির মোহ ও জবাবদিহিতার ভয়

 

মানুষের স্বভাবগত একটি বড় দুর্বলতা হলো সে প্রশংসা এবং খ্যাতি পছন্দ করে। আর সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে সবাইকে এক একজন ইনফ্লুয়েন্সার বা প্রভাবক হওয়ার ইঁদুরদৌড়ে নামিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ইসলাম আমাদের এই খ্যাতির মোহ এবং এর পেছনের ভয়ংকর দায়িত্ব সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেছে

বিখ্যাত তাবেয়ি সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলেছিলেন:

আমি এমন কোনো জিনিস দেখিনি, যা মানুষের ঘাড়কে এত দ্রুত মটকে দেয় (ধংস করে), যা এই খ্যাতির মোহ দেয়।

একজন ইনফ্লুয়েন্সার যখন কোনো ভুল কন্টেন্ট, কোনো অশ্লীল বার্তা বা দ্বীন-বিমুখ লাইফস্টাইল লাখ লাখ মানুষের সামনে প্রচার করে, তখন সে আসলে শুধু নিজের গুনাহের বোঝা ভারী করে না; বরং তার দেখাদেখি যত মানুষ সেই পথে পা বাড়ায়, তাদের সবার গুনাহের একটি অংশও তার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকে

রাসূলুল্লাহ এই ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন:

যে ব্যক্তি কোনো মন্দ বা ভ্রষ্টতার দিকে মানুষকে আহ্বান করবে, তার ওপর তার অনুসারীদের সমপরিমাণ গুনাহ বর্তাবে, অথচ তাদের গুনাহের কোনো কমতি হবে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৭৪)

ফাহিম বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগল। সে ভাবল, আমি যদি আজ মারা যাই, তবে আমার এই মিলিয়ন ভিউয়ার্স আমার জন্য সাদাকায়ে জারিয়াহ হবে, নাকি গুনাহে জারিয়াহ (চলমান পাপ) হিসেবে থেকে যাবে? আমার কন্টেন্ট দেখে যদি কোনো তরুণ নামাজ ছেড়ে রিলস দেখতে মগ্ন হয়, তবে আল্লাহর দরবারে আমি কী জবাব দেব? এই ভয় তার ভেতরের সুপ্ত ঈমানকে এক তীব্র ঝাঁকুনি দিল

 

মেকি আলো থেকে খাঁটি আলোর পথে

 

ফাহিম বেশ কয়েকদিন কোনো ভিডিও পোস্ট করল না। ব্র্যান্ডগুলোর স্পন্সরশিপের তাগাদা, ফ্যানদের ব্যাকুল মেসেজসবকিছু সে একপাশে সরিয়ে রাখল। সে ঢাকার একজন প্রবীণ ও নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে গেল। তাঁর পায়ে বসে ফাহিম কেঁদে ফেলল এবং নিজের ভেতরের এই মানসিক দ্বন্দ্বের কথা খুলে বলল

আলেম সাহেব ফাহিমের মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, বাবা ফাহিম, আল্লাহ তোমাকে মানুষের মনে প্রভাব তৈরি করার এক বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন। এই ক্ষমতা একটা বড় আমানত। তুমি এতদিন এই ক্ষমতা শয়তানের বাজারে সস্তায় বিক্রি করেছ। এখন সময় এসেছে এই একই ক্ষমতা আল্লাহর দ্বীনের জন্য, যুবসমাজের জাগরণের জন্য ব্যবহার করার। ইনফ্লুয়েন্সার হওয়া তো সাময়িক, তুমি আল্লাহর একজন খাঁটি দাঈ (দ্বীনের আহ্বায়ক) হওয়ার চেষ্টা করো।

এই কথাটি ফাহিমের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, তাকে তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলো ডিলিট করতে হবে না; বরং সেগুলোর উদ্দেশ্য এবং কন্টেন্ট আমূল বদলে ফেলতে হবে

 

একজন নতুন দাঈ-এর আত্মপ্রকাশ

 

এক মাস পর ফাহিম আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়াল। তবে এবার তার পরনে কোনো জাঁকজমকপূর্ণ চটকদার পোশাক ছিল না, চোখে ছিল না কোনো কৃত্রিম অহংকার। অত্যন্ত বিনম্র ও শান্ত কণ্ঠে সে ভিডিও শুরু করল

সে বলল, প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমি এতদিন আপনাদের শুধু বিনোদন দিয়েছি, যা আপনাদের সাময়িক হাসালেও হয়তো অন্তরের শান্তি দিতে পারেনি। আজ আমি আপনাদের সামনে কোনো ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে আসিনি, এসেছি একজন অনুতপ্ত ভাই হিসেবে। আসুন, আমরা এই স্ক্রিনের মায়া ছেড়ে আমাদের আসল গন্তব্য আখিরাতের দিকে ফিরে যাই...

ভিডিওটি আপলোড হওয়ার পর ইন্টারনেটে ঝড় উঠে গেল। প্রথম দিকে অনেকেই তাকে নিয়ে ট্রোল করল, অনেকে বলল নতুন নাটক শুরু করেছে। কিন্তু ফাহিম দমে গেল না। সে নিয়মিত তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা, সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি এবং কীভাবে কোরআন-সুন্নাহর আলোয় আধুনিক জীবন সাজানো যায়তা নিয়ে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও আধুনিক ভিজ্যুয়াল দিয়ে ভিডিও তৈরি করতে শুরু করল

যেহেতু সে তরুণদের ভাষা ও মনস্তত্ত্ব খুব ভালো বুঝত, তাই তার এই নতুন দাওয়াহ কন্টেন্ট যুবসমাজের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধতে লাগল। শত শত তরুণ তার ভিডিওর কমেন্ট বক্সে এসে লিখতে লাগলফাহিম ভাই, আপনার ভিডিও দেখে আজ এক বছর পর ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছিলাম।, আপনার কথাগুলো শুনে আমি আমার ফোনের নোংরা অ্যাপগুলো ডিলিট করে দিয়েছি।

ফাহিম এখন আর সস্তা খ্যাতির পেছনে ছোটে না। প্রতিবার ভিডিও করার আগে সে তার নিয়তকে শুদ্ধ করে নেয় এবং আল্লাহর কাছে ইখলাস প্রার্থনা করে। মানুষের হাততালি বা লাইকের সংখ্যার চেয়ে একটি বিভ্রান্ত আত্মার আল্লাহর পথে ফিরে আসাটাই এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ইনফ্লুয়েন্সারের সেই মেকি আলো থেকে মুক্ত হয়ে ফাহিম আজ ডিজিটাল দুনিয়ার এক নির্ভীক দাঈ, যে নিজের লক্ষাধিক ফলোয়ারকে জান্নাতের পথ দেখানোর এক আলোকবর্তিকায় পরিণত হয়েছে

 

 

 

 

 

অধ্যায় ১৪

 

মৃত্যুর আগের শেষ স্ট্যাটাস

 

জিলহজ মাসের এক তপ্ত দুপুর। ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ তানভীরের চোখ আটকে গেল তার এক সময়ের খুব কাছের বন্ধু ফুয়াদের প্রোফাইল পিকচারে। কিন্তু ছবির ওপরে ফুয়াদের নামের পাশে কোনো নতুন স্ট্যাটাস নেই, বরং সেখানে যুক্ত হয়েছে একটি ছোট্ট শব্দRemembering

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ফুয়াদের আইডিটিকে মেমোরিয়াল পেজ বা স্মারক আইডিতে রূপান্তর করেছে

তানভীরের বুকটা ধক করে উঠল। ফুয়াদ আর এই দুনিয়ায় নেই। মাত্র দুই দিন আগে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় সে মারা গেছে। তানভীর ফুয়াদের টাইমলাইনে গিয়ে দেখল, শত শত মানুষ সেখানে এসে দুঃখ প্রকাশ করছে, কমেন্ট বক্সে লিখছে ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বা বিশ্বাস করতে পারছি না ভাই, তুই আর নেই!

কিন্তু তানভীরের চোখ চলে গেল ফুয়াদের দেওয়া একেবারে শেষ ফেসবুক স্ট্যাটাসটির দিকে, যা সে মৃত্যুর ঠিক তিন ঘণ্টা আগে পোস্ট করেছিল

স্ট্যাটাসটি ছিল একটি চটকদার মিম, যাতে একটি হিন্দি গানের ভিডিও ক্লিপ এবং কিছু অশালীন কৌতুক যুক্ত ছিল। ফুয়াদ যখন ওটা পোস্ট করেছিল, সে হয়তো মনের ভুলেও ভাবেনিএটিই হতে যাচ্ছে এই পৃথিবীতে তার শেষ আঙুলের ছোঁয়া। সে হয়তো ভেবেছিল, রাতে বাড়ি ফিরে বন্ধুদের কমেন্টের রিপ্লাই দেবে, ভিউ দেখবে। কিন্তু মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে সেই সুযোগ দেননি

কবরের অন্ধকারের দিকে ফুয়াদ যখন যাত্রা করল, তখন তার ডিজিটাল পৃথিবীর শেষ পদচিহ্ন হিসেবে রয়ে গেল একটি গুনাহের উপাদান। তানভীরের গা শিউরে উঠল। সে ভাবল, আজ যদি ফুয়াদের জায়গায় আমি হতাম? আমার মৃত্যুর আগের শেষ স্ট্যাটাস বা দেখা শেষ ভিডিওটি যদি হতো কোনো হারাম কন্টেন্ট, তবে আল্লাহর সামনে আমি কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াতাম?

 

ডিজিটাল পদচিহ্ন এবং চলমান পাপ (গুনাহে জারিয়া)

 

মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য। আমরা যখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব, আমাদের ঘরবাড়ি, টাকা-পয়সা, ডিগ্রিসবকিছু পেছনে পড়ে থাকবে। কিন্তু আধুনিক এই ডিজিটাল যুগে আমাদের আরও একটি জিনিস পেছনে থেকে যাবে, যা অতীতের মানুষের ছিল নাতা হলো আমাদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা ডিজিটাল পদচিহ্ন

আমাদের ফেসবুক আইডি, ইউটিউব চ্যানেল, ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল কিংবা টিকটক অ্যাকাউন্ট আমাদের মৃত্যুর পরও ইন্টারনেটের সার্ভারে বেঁচে থাকবে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের অ্যাকাউন্টে যে জিনিসগুলো রেখে যাচ্ছি, সেগুলো আমাদের মৃত্যুর পর কবরে সওয়াব পাঠাবে নাকি গুনাহের বোঝা বাড়াবে?

ইসলামে সাদাকায়ে জারিয়া বা চলমান নেক আমলের যেমন ধারণা আছে, ঠিক তেমনি গুনাহে জারিয়া বা চলমান পাপের এক ভয়ংকর ধারণাও রয়েছে

রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

যে ব্যক্তি মানুষকে কোনো ভ্রষ্টতা বা গুনাহের দিকে আহ্বান করবে, তার ওপর সেই গুনাহের বোঝা বর্তাবে এবং মৃত্যুর পরও যত মানুষ তার সেই গুনাহের কাজ অনুসরণ করবে, তাদের সবার সমপরিমাণ গুনাহ তার আমলনামায় যোগ হতে থাকবে, অথচ তাদের গুনাহের কোনো কমতি হবে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৪)

একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখুন। একজন মানুষ মারা গিয়ে কবরে শুয়ে আছে, সে আর নতুন কোনো আমল করতে পারছে না। কিন্তু দুনিয়াতে তার শেয়ার করা একটি অশ্লীল ভিডিও, একটি গানের ক্লিপ, কিংবা কারও নামে করা একটি কুৎসিত গীবতের পোস্ট অনবরত মানুষ দেখছে, লাইক দিচ্ছে আর শেয়ার করছে। এর ফলে প্রতি সেকেন্ডে তার কবরের আমলনামায় গুনাহের ডিজিটাল মিটার সচল থাকছে। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে!

 

মৃত্যুর স্মরণ ও ডিজিটাল আমলের হিসাব

 

আমরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন দুনিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকি, তখন শয়তান আমাদের মন থেকে মৃত্যুর চিন্তা সম্পূর্ণ মুছে দেয়। আমাদের মনে হয়, আমরা চিরকাল এই স্ক্রিন স্ক্রল করব, চিরকাল লাইক-কমেন্টের হিসাব মেলাবো। অথচ আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আমাদের আমাদের আসল গন্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:

প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৮৫)

মৃত্যু কোনো বয়স বা সময় মেনে আসে না। ফুয়াদের এই আকস্মিক বিদায় তানভীরের চোখের সামনে থেকে উদাসীনতার পর্দাটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। তানভীর নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে তার ফোনের স্ক্রিনটার দিকে তাকাল। সে তার ব্রাউজিং হিস্ট্রি দেখল, তার দেওয়া পুরোনো পোস্টগুলো ঘাটল

সে নিজেকে প্রশ্ন করল, আমার মৃত্যুর পর এই আইডিটা কি আমার পক্ষে সাক্ষী দেবে, নাকি বিপক্ষে? আমি বন্ধুদের ইনবক্সে যে ভাষা ব্যবহার করেছি, যে ছবিগুলো আদান-প্রদান করেছি, তা যদি আজ আমার মা-বাবা বা শিক্ষকেরা দেখে ফেলেন, তবে আমি লজ্জায় মরে যাব। অথচ কিয়ামতের দিন মহাবিশ্বের প্রতিপালক এবং সমস্ত মানবজাতির সামনে যখন আমার এই ডিজিটাল আমলনামা উন্মুক্ত করা হবে, তখন আমার অবস্থা কেমন হবে?

 

ডিজিটাল আমলনামা পরিচ্ছন্ন করার লড়াই

 

ফুয়াদের দাফন শেষ করে এসে তানভীর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। সে তার স্মার্টফোনটি হাতে নিল। সে তার ফেসবুক আইডিতে ঢুকে গত কয়েক বছরের সমস্ত পোস্ট একে একে চেক করতে লাগল

যেকোনো পোস্টে সামান্যতম অশ্লীলতা, কোনো গানের ভিডিও, কোনো মানুষের নামে করা উপহাস বা অপ্রয়োজনীয় ট্রোল ছিলতানভীর তা চিরতরে ডিলিট করে দিল। অনেক পুরোনো পেজ বা গ্রুপ যেগুলোতে যুক্ত থাকলে টাইমলাইনে নোংরা বা অর্থহীন কন্টেন্ট আসে, সেগুলো থেকে সে লিভ নিল

এরপর সে তার আইডির বায়ো বা প্রোফাইল ডেসক্রিপশনে একটি সুন্দর লাইন লিখে দিলযদি আমি কোনোদিন হঠাৎ মরে যাই, তবে আমার কোনো পোস্টে বা কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে দয়া করে আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষমা করে দেবেন। আর আমার প্রোফাইলে কোনো ভুল কিছু থাকলে তা এড়িয়ে চলবেন।

সে তার ফোনের মেসেঞ্জারে গিয়ে বন্ধুদের একটি কমন মেসেজ পাঠাল, ভাইয়েরা, আমি অজান্তে যদি চ্যাটিংয়ে কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকি বা কোনো ভুল জিনিস শেয়ার করে থাকি, আমাকে মাফ করে দিও। চলো, আমরা আমাদের ডিজিটাল জীবনটাকে একটু পরিচ্ছন্ন করি।

তানভীর ওজু করে জায়নামাজে বসল। ফুয়াদের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করার পাশাপাশি সে নিজের জন্য দীর্ঘ সময় কাঁদল। সে আল্লাহর কাছে বলল, ইয়া গাফুরুর রাহিম! আমার মৃত্যুর আগের শেষ স্ট্যাটাসটি যেন কোনো গুনাহের সাক্ষী না হয়। আমার ডিজিটাল জীবনকে আপনি আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যম বানিয়ে দিন।

সেদিন থেকে তানভীর যখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু পোস্ট করতে যায়, তার আঙুল দুটো কিবোর্ডে থমকে দাঁড়ায়। সে নিজেকে মনে করিয়ে দেয়এটিই যদি আমার জীবনের শেষ পোস্ট হয়? মৃত্যুর এই অমোঘ স্মরণ তানভীরের ডিজিটাল জীবনকে এক পরম পবিত্রতা আর পরকালমুখী চেতনায় ভরিয়ে দিল

 

 

অধ্যায় ১৫

 

যখন ফলোয়ার নয়, আমল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল

 

রাইয়ানের ফেসবুক প্রোফাইলে এখন ব্লু ব্যাজ শোভা পাচ্ছে। তার অনুসারী বা ফলোয়ারের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে পাঁচ লাখ। প্রতিটা স্ট্যাটাস দেওয়ার সাথে সাথে হাজার হাজার শেয়ার হয়, ইনবক্সে জমা হয় শত শত মেসেজ। তরুণদের মাঝে সে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী মোটিভেশনাল স্পিকার এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। মানুষ তাকে এক নামে চেনে

কিন্তু এই বিশাল ফলোয়ার সংখ্যার আড়ালে রাইয়ানের ভেতরের আধ্যাত্মিক জীবনটা দিন দিন খাটো হয়ে আসছিল। সে লক্ষ্য করল, ইদানীং সে যখন কোনো সামাজিক বা দ্বীনি বিষয়ে পোস্ট লেখে, তার মন আল্লাহর চেয়ে বেশি মগ্ন থাকেএই পোস্টটা কতজন শেয়ার করল? রিচ কেমন হলো? ভিউয়ার্সরা কমেন্টে বাহবা দিচ্ছে তো?

সবচেয়ে ভীতিপ্রদ বিষয় হলো, তার ব্যক্তিগত ইবাদতগুলো এক চরম যান্ত্রিকতায় রূপ নিয়েছিল। একসময় সে যখন একা একা নামাজ পড়ত, তার চোখ দিয়ে পানি পড়ত। আর এখন সে যখন সিজদায় যায়, তার মাথায় ঘোরে পরের ভিডিওর স্ক্রিপ্ট কিংবা কোনো ফলোয়ারের করা সমালোচনার জবাব। মানুষের এই বিপুল মনোযোগ তাকে এক অদৃশ্য অহংকার আর আত্মতুষ্টির কারাগারে বন্দি করে ফেলেছিল। সে ভার্চুয়াল দুনিয়ার জনপ্রিয়তার পাল্লায় নিজের ঈমান ও আমলের ওজন মেলাতে শুরু করেছিল

একদিন বিকেলে রাইয়ান তার লাইব্রেরিতে বসে ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.)-এর একটি বিখ্যাত কিতাব পড়ছিল। সেখানে একটি লাইন তার বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধল:

দুনিয়ার মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত কিন্তু আল্লাহর কাছে বিন্দুমাত্র মূল্যহীনএর চেয়ে বড় দেউলিয়া আর কেউ নেই। মানুষের হাততালি তোমাকে কবরের আজাব থেকে বাঁচাতে পারবে না।

রাইয়ান স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। সে তার পাঁচ লাখ ফলোয়ারের স্ক্রিনটার দিকে তাকাল। সে ভাবল, কিয়ামতের দিন যখন বিচার হবে, তখন কি আল্লাহ তার ফেসবুকের ফলোয়ার কাউন্ট বা লাইকের সংখ্যা দেখে জান্নাত দেবেন? নাকি তার অন্তরের ইখলাস আর আমল দেখে বিচার করবেন? এই একটি তীব্র প্রশ্ন রাইয়ানের অহংকারের দেয়ালটাকে চুরমার করে দিল

 

ভার্চুয়াল ফলোয়ার বনাম আখিরাতের আমল

 

আজকের ডিজিটাল যুগে আমাদের সাফল্যের মাপকাঠি বদলে গেছে। আমরা একজন মানুষের যোগ্যতা, সম্মান এমনকি তার দ্বীনদারির গভীরতাও পরিমাপ করি তার সোশ্যাল মিডিয়ার ফলোয়ার, সাবস্ক্রাইবার বা ভিউয়ের সংখ্যা দেখে। এই মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে আমাদের তরুণ সমাজ আমল এবং চরিত্র গঠনের আসল কাজটাই ভুলে যাচ্ছে। আমরা মানুষের কাছে জনপ্রিয় হতে চাই, কিন্তু আরশের মালিকের কাছে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকুতা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবি না

ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, আল্লাহর দরবারে সংখ্যার কোনো মূল্য নেই, যদি না তার পেছনে ইখলাস বা খাঁটি নিয়ত থাকে

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন:

যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন যেকাজে তোমাদের মধ্যে কে সর্বোত্তম? আর তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল। (সূরা আল-মূলক, আয়াত: ২)

লক্ষ্য করুন, আল্লাহ এখানে কে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে বা কার ফলোয়ার বেশি তা বলেননি; বরং বলেছেন কাজে কে সর্বোত্তম (Quality of Deeds)

আমরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ার সস্তা প্রশংসার পেছনে ছুটি, তখন আমাদের আমলের কোয়ালিটি বা মান নষ্ট হয়ে যায়। বিখ্যাত সাহাবি হযরত আলী (রা.) বলতেন:

আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারে তোমরা যতটা চিন্তিত, আমল করার ব্যাপারে ততটা নও। কারণ ইখলাস ছাড়া আমল হলো এমন এক মুসাফিরের মতো, যে তার ব্যাগে পাথরের টুকরো ভরে ঘোরে; যা কেবল তার বোঝাই বাড়ায়, কোনো উপকারে আসে না।

 

কিয়ামতের সেই নির্মম দাঁড়িপাল্লা

 

রাইয়ান সেদিন রাতে এক গভীর আত্মোপলব্ধির মুখোমুখি হলো। সে তার ডায়েরিটা খুলে নিজের আমলনামার একটা কাল্পনিক হিসাব মেলাতে বসল

একপাশে সে লিখল: ৫ লাখ ফেসবুক ফলোয়ার, ১০ মিলিয়ন ভিউ, হাজারটা পজিটিভ কমেন্ট

অন্য পাশে সে নিজের আসল আমলগুলো লিখল: ফজরের নামাজে অলসতা, মা-বাবার সাথে ইদানীং রুক্ষ আচরণ, একাকী জীবনে কোরআন তিলাওয়াতের চরম অভাব, আর অন্তরের ভেতর লুকিয়ে থাকা রিয়া বা লোকদেখানো মানসিকতা

রাইয়ানের চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল। সে বুঝতে পারল, সে এক ভয়ংকর ধোঁকার মধ্যে বাস করছে। কিয়ামতের দিন যখন তার আমলনামা ওজন করা হবে, তখন এই পাঁচ লাখ ফলোয়ারের একজনও তার দাঁড়িপাল্লার পাশে এসে দাঁড়াবে না। কেউ তার একটা গুনাহের দায় নিজের কাঁধে নেবে না

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সেই দিনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন:

যেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা ও তার বাবার কাছ থেকে, তার স্ত্রী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই এমন এক গুরুভার অবস্থা হবে, যা তাকে সম্পূর্ণ ব্যস্ত করে রাখবে। (সূরা আবাসা, আয়াত: ৩৪-৩৭)

রাইয়ান ভাবল, যেদিন নিজের মা-বাবাই সন্তানকে চিলবে না, সেদিন আমার এই ভার্চুয়াল ফলোয়াররা আমার কী উপকারে আসবে? আমি কেন মানুষের ওয়ালে নিজের সস্তা প্রশংসা খোঁজার জন্য আমার আখিরাতকে ধ্বংস করছি?

 

আরশের নিচে গ্রহণযোগ্যতার খোঁজে

 

সেদিনই রাইয়ান তার ভার্চুয়াল জীবনে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলল। সে নিজেকে সেলিব্রিটি ভাবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিল। সে তার সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সময় এক-চতুর্থাংশে নামিয়ে আনল। যে সময়টুকু সে আগে কমেন্ট পড়া আর ভিউ চেক করার পেছনে নষ্ট করত, এখন সেই মূল্যবান সময়টুকু সে নিজের আত্মশুদ্ধি, নিভৃত রাতের ইবাদত আর পরিবারের সেবায় ব্যয় করতে শুরু করল

সে তার দাওয়াহ কন্টেন্টগুলো জারি রাখল ঠিকই, কিন্তু ভিডিও আপলোড করার পর সে আর ভিউ বা লাইক চেক করার জন্য ফোনের দিকে তাকাত না। সে মনে মনে বলত, হে আল্লাহ, এই কথাগুলো শুনে যদি একটি মাত্র ছেলেও আলোর পথে ফিরে আসে, আর আপনি যদি আমার এই ভাঙা আমলটুকু কবুল করেনতবেই আমার জীবন সার্থক। আমার কোনো ফলোয়ারের প্রশংসার প্রয়োজন নেই।

রাইয়ান এখন প্রতিদিন মাঝরাতে ঘুম থেকে ওঠে। যখন পুরো পৃথিবীর মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, তখন সে তার ঘরের এক কোণে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়ায়। কোনো লাইভ ক্যামেরা নেই, কোনো অডিয়েন্স নেইআছে শুধু সে আর তার মহান রব। সে যখন সেজদায় গিয়ে কাঁদে, তখন তার অন্তরে যে স্বর্গীয় হালকা অনুভূতির সৃষ্টি হয়, তা সে পাঁচ লাখ ফলোয়ারের কোনো লাইক বা কমেন্টের মধ্যেও কখনো খুঁজে পায়নি

মানুষের টাইমলাইনে ট্রেন্ডিং হওয়ার চেয়ে আল্লাহর আরশের নিচে একজন মকবুল বান্দা হওয়াটাই যে জীবনের একমাত্র এবং আসল উদ্দেশ্যরাইয়ান আজ তার অশ্রুসিক্ত জায়নামাজে তা সম্যক উপলব্ধি করতে পারল। তার কাছে এখন ফলোয়ার নয়, প্রতিটা নেক আমলই হয়ে উঠল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

 

 

অধ্যায় ১৬

 

সোশ্যাল মিডিয়ার ওপারে

 

ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বিকেলের বাতাসটা আজ বেশ স্নিগ্ধ। রিয়াজ একটি কাঠের বেঞ্চে বসে আছে। ঠিক এই লেকের পাড়েই আজ থেকে এক বছর আগে সে নীল শার্ট আর সানগ্লাস পরে সেই ছবিটা তুলেছিল, যার লাইক আর কমেন্টের সংখ্যা গুনতে গিয়ে সে তার বাস্তব জীবনের বন্ধুদের অবহেলা করেছিল, মায়ের ফোন কেটে দিয়েছিল

আজও রিয়াজের পরনে নীল শার্ট, তবে তার চোখে কোনো কৃত্রিম চশমা নেই, মুখে নেই কোনো মেকি দেখনদারির অভিব্যক্তি। তার চোখ দুটো এখন শান্ত, আর অবয়বে লেপ্টে আছে এক অদ্ভুত আত্মিক তৃপ্তির আভা

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তার হাতে। রিয়াজের হাত দুটো এখন আর পকেটের ফোনের দিকে ছটফট করে না। ফোনটা তার পকেটেই আছে, তবে তা সম্পূর্ণ সাইলেন্ট মোডে। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লেকের পানির মৃদু ঢেউয়ের দিকে, আর তার আঙুলগুলো অবচেতনভাবেই সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ জপছে

বিগত বারোটি মাস রিয়াজের জন্য ছিল এক কঠিন আত্মশুদ্ধির যুদ্ধ। সোশ্যাল মিডিয়ার সেই চটকদার দুনিয়া, নোটিফিকেশনের সেই ডোপামিন হিট এবং মানুষের সস্তা বাহবা পাওয়ার যে মরণফাঁদে সে বন্দি ছিলতা থেকে বের হয়ে আসা সহজ ছিল না। শুরুর দিকে তার মনে হতো সে যেন এক অন্ধকার দ্বীপে নির্বাসিত হয়েছে। কিন্তু সে যখনই অস্থির বোধ করত, তখনই সে আল্লাহর কালামের দিকে ফিরে যেত, জায়নামাজে গিয়ে দীর্ঘ সেজদায় লুটিয়ে পড়ত

আজ রিয়াজ এক সম্পূর্ণ নতুন মানুষ। সে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপারে থাকা এক জীবন্ত, সুন্দর ও অর্থবহ বাস্তব পৃথিবীর সন্ধান পেয়েছে

 

মরীচিকা ভেঙে বাস্তবের আলোয়

 

আমরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ার পাঁচ ইঞ্চির দেয়ালটার ওপারে উঁকি দিই, তখন আমরা আসলে জীবনের এক বিরাট অংশকে হারিয়ে ফেলি। রিয়াজ তার এই এক বছরের পরিবর্তনে বুঝতে পেরেছে, মানুষ যখন ভার্চুয়াল দুনিয়ার আসক্তি থেকে মুক্ত হয়, তখন তার চারপাশের বাস্তব সম্পর্কগুলো কত চমৎকারভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়

যে মায়ের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে সে মাঝরাত পর্যন্ত স্ক্রল করত, এখন সে মাগরিবে নামাজ শেষ করেই মায়ের পাশে গিয়ে বসে। মায়ের ক্লান্তিভরা মুখের দিকে হাসিমুখে তাকানো যে একটি নফল ইবাদতের সমতুল্য সওয়াব এনে দেয়, রিয়াজ তা এখন অন্তর দিয়ে অনুভব করে। সে তার বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসলে এখন আর টেবিলের নিচে ফোন টেপে না; বরং বন্ধুদের চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের সুখ-দুঃখের গল্প শোনে

ইসলাম আমাদের এই বাস্তবমুখী এবং দায়িত্বশীল জীবন যাপন করতেই শিখিয়েছে। দুনিয়ার জীবনটা কেবলই এক ধোঁকার সামগ্রী, যদি না একে আখেরাতের পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা হয়

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন:

আর এই দুনিয়ার জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর নিশ্চয়ই আখিরাতের আবাসই হলো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত! (সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ৬৪)

ভার্চুয়াল দুনিয়ার লাইক, কমেন্ট, ফলোয়ার আর ভিউ হলো এই খেল-তামাশার আধুনিক রূপ। রিয়াজ আজ বুঝতে পেরেছে, স্ক্রিনের ভেতরের সেই জীবনটা ছিল এক মস্ত বড় ফাঁপা মরীচিকা, আর স্ক্রিনের ওপারে আল্লাহর তৈরি এই বিশাল পৃথিবী, মা-বাবার মমতা, দ্বীনের জ্ঞান অর্জন আর আমল দিয়ে জীবন সাজানোই হলো প্রকৃত জীবন

 

ডিজিটাল মুসলিমের নতুন শপথ

 

রিয়াজ কিন্তু তার ফোন বা ইন্টারনেট পুরোপুরি ত্যাগ করেনি। সে এখন একজন সচেতন ডিজিটাল মুসলিম। সে তার ফোনটিকে এখন ব্যবহার করে কেবলই একটি প্রয়োজন মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে, ফোন যেন তাকে ব্যবহার করতে না পারেসে সেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে

সে এখন দিনে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। তার ফেসবুক ওয়ালে এখন আর নিজের কোনো প্রদর্শনী বা অহংকারের ছবি থাকে না; বরং সেখানে থাকে কোনো নিঃস্ব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান, কোনো সহিহ হাদিসের বাণী কিংবা সমাজ সচেতনতামূলক কোনো গঠনমূলক বার্তা। সে মানুষের ওয়ালে গ্রহণযোগ্যতা খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ সে জানেএকমাত্র আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হওয়াই জীবনের আসল সার্থকতা

রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে মানুষের কল্যাণে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে। (আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৫৭৮৭)

রিয়াজ এখন ক্যাম্পাসের তরুণদের নিয়ে একটি ছোট দ্বীনি সার্কেল বা হালাকা তৈরি করেছে। সে তার বন্ধুদের বোঝায় কীভাবে এক মিনিটের একটি রিলস আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা গুনাহের সাগরে ডুবিয়ে দেয়, কীভাবে রাত জাগা স্ক্রলিং আমাদের তাহাজ্জুদ আর ফজর নামাজ কেড়ে নেয়। রিয়াজের এই বাস্তব জীবনের পরিবর্তন দেখে ক্যাম্পাসের আরও অনেক তরুণ আজ তাদের স্মার্টফোনের আসক্তি ভেঙে আলোর পথে ফিরে আসতে শুরু করেছে

 

নতুন জীবনের অনন্ত যাত্রা

 

লেকের পাড়ে মাগরিবের আযানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসতেই রিয়াজ বেঞ্চ ছেড়ে উঠল। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে একবার দেখলকোনো নোটিফিকেশন চেক করার জন্য নয়, শুধু সময়টা দেখার জন্য। স্ক্রিনে কোনো অপঠিত মেসেজ বা লাইকের কাউন্ট তাকে আর আলোড়িত করে না

সে লেকের ঠান্ডা পানিতে পরম শান্তিতে ওজু করল। ওজু শেষে যখন সে মসজিদের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল, তখন তার মনে হলোএক বছর আগের সেই রিয়াজ স্ক্রিনের এক অন্ধকূপে মৃতপ্রায় হয়ে বেঁচে ছিল। আর আজকের এই রিয়াজ আল্লাহর রহমতের আলোয় এক সম্পূর্ণ স্বাধীন ও জীবন্ত মানুষ

স্মার্টফোনের স্ক্রিনের সেই সাময়িক ও কৃত্রিম আলো তাকে আর টানে না, কারণ তার অন্তরে এখন প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে ঈমানের চিরস্থায়ী ও প্রশান্তিময় আলো। সোশ্যাল মিডিয়ার ওপারে এসে রিয়াজ আজ খুঁজে পেয়েছে তার জীবনের আসল গন্তব্যযা তাকে নিয়ে যাচ্ছে দুনিয়ার শান্তি আর আখিরাতের অনন্ত জান্নাতের দিকে

 

কিয়ামতের দিন আমার টাইমলাইন

 

একটুখানি চোখ বন্ধ করে সেই দিনটির কথা কল্পনা করুন, যেদিন এই চিরচেনা পৃথিবী আর থাকবে না। মহাবিশ্বের সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যাবে। আকাশ ফেটে চৌচির হবে, পাহাড়গুলো ধুলোর মতো উড়তে থাকবে। সূর্য নেমে আসবে মাথার ওপরে, আর মানবজাতি এক চরম ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি (হায় আমার কী হবে) অবস্থায় ইয়াওমুল কিয়ামাহ বা হাশরের ময়দানে এসে দাঁড়াবে

সেই মহাবিচারের দিনে, যখন আমাদের প্রত্যেকের হাতে আমাদের আমলনামা বা কিতাব তুলে দেওয়া হবে, তখন আমাদের এই আধুনিক প্রজন্মের আমলনামার একটি বিশাল এবং প্রধান অংশ জুড়ে থাকবে আমাদের ডিজিটাল টাইমলাইন

আমরা প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি মিনিট এবং সেকেন্ড এই পাঁচ ইঞ্চির স্ক্রিনের ভেতরে যেভাবে কাটিয়েছি, তার একটি নিখুঁত, অপরিবর্তনীয় এবং লাইভ ডিজিটাল রেকর্ড আল্লাহর সামনে উন্মুক্ত করা হবে। সেখানে কোনো ডিলিট বোতাম থাকবে না, থাকবে না কোনো ক্লিয়ার হিস্ট্রি বা ইনকগনিটো মোড ব্যবহারের সুযোগ। মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া গেলেও আল-খবীর (যিনি সবকিছুর খবর রাখেন), তাঁর সার্ভার থেকে কোনো ডেটা মুছে ফেলা অসম্ভব

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে সেই দিনের অমোঘ চিত্র তুলে ধরেছেন:

আর আমলনামা সামনে রাখা হবে। তখন আপনি অপরাধীদের দেখবেন, তাদের আমলনামায় যা আছে তার কারণে তারা আতঙ্কিত এবং তারা বলছেহায় আফসোস! এটা কেমন আমলনামা! এটা ছোট-বড় কোনো কাজই বাদ দেয়নি, বরং সবকিছুই পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করে রেখেছে! তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আর আপনার রব কারও প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করবেন না। (সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৪৯)

আমাদের আজকের এই ডিজিটাল জীবনআমাদের প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি শেয়ার, কমেন্ট আর রিলস দেখার মুহূর্তগুলো সেদিন এই কিতাবের পাতায় পাতায় জ্বলজ্বল করবে

 

আমাদের ডিজিটাল বিবেকের কাছে ৪টি সমাপনী প্রশ্ন

 

বইয়ের এই শেষ প্রান্তে এসে, আসুন আমরা প্রত্যেকে আমাদের ফোনটি হাত থেকে এক মুহূর্তের জন্য পাশে রাখি এবং আমাদের অন্তরের গভীর থেকে নিজেদের বিবেকের কাছে ৪টি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি:

১. আমার পোস্টগুলো কি আমার পক্ষে সাক্ষী হবে?

আমরা আমাদের ওয়ালে যে ছবিগুলো ঝুলিয়েছি, যে ক্যাপশনগুলো লিখেছি, চটকদার ভিউ আর লাইক পাওয়ার জন্য যে ভিডিওগুলো আপলোড করেছিসেগুলো কি কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে আমাদের নেক আমলের পাল্লাকে ভারী করবে? নাকি সেগুলো আমাদের গুনাহে জারিয়াহ বা চলমান পাপের কারণ হয়ে আমাদের জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যাবে?

২. আমার মন্তব্যগুলো কি আমার পক্ষে যাবে?

কমেন্ট বক্সের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলো, যেখানে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার অহংকারে মেতে আমরা অন্য একজন মানুষকে মূর্খ, ভণ্ড বলে গালি দিয়েছি, উপহাস করেছি, কিংবা গীবত ও কুৎসা রটিয়েছিসেই মন্তব্যগুলো কি সেদিন আমাদের পক্ষে সাফাই গাইবে? নাকি সেই অচেনা মানুষগুলো আল্লাহর আদালতে আমাদের নেক আমলগুলো কেড়ে নিয়ে আমাদের দেউলিয়া করে ছাড়বে?

৩. আমার দেখা ভিডিওগুলো কি আমাকে উপকার দেবে?

মাঝরাতে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা যে রিলস, শর্টস, মিউজিক ভিডিও বা নিষিদ্ধ কন্টেন্টগুলো স্ক্রল করে গেছি, যা দেখতে দেখতে আমাদের অন্তরের নূর নিভে গেছে এবং আমরা ফজর নামাজ হারিয়ে ফেলেছিসেই ভিডিওগুলো কি হাশরের ময়দানের সেই তপ্ত দুপুরে আমাদের বিন্দুমাত্র শান্তি দিতে পারবে?

৪. আমার ডিজিটাল জীবন কি আমাকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে?

যে স্মার্টফোনটি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে, যা আমরা দিনে শত শত বার স্পর্শ করিসেই ডিভাইসটি কি আমাদের আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে, নাকি দিন দিন আমাদের আখেরাত, ঈমান ও চরিত্র থেকে দূরে সরিয়ে এক অদৃশ্য ধ্বংসের শৃঙ্খলে বন্দি করে ফেলছে?

 

শেষ ডাক: এখনই সময় পরিবর্তনের

প্রিয় পাঠক, আপনি যদি এই লাইনগুলো পড়তে পারছেন, তবে তার মানে একটাইআল্লাহ আপনাকে এখনো সময় দিয়েছেন। আপনার ফুসফুসে এখনো শ্বাস-প্রশ্বাস সচল আছে, আপনার আঙুলগুলো এখনো তাওবার জন্য ওজু করতে সক্ষম এবং আপনার ফোনের স্ক্রিনটি এখনো শয়তানের খাঁচা ভেঙে আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসার মাধ্যম হতে পারে

স্মার্টফোনের স্ক্রিনের আলো সাময়িক, তা কয়েক ঘণ্টার চার্জ শেষ হলেই নিভে যায়। কিন্তু ঈমানের আলো চিরস্থায়ী, যা কবরের অন্ধকার থেকে শুরু করে হাশরের ময়দান এবং পুলসিরাতের ভয়ংকর পথ পার করে আমাদের জান্নাতের আলোকময় প্রাসাদে পৌঁছে দেবে

আসুন, আজ এই মুহূর্তেই আমরা এক নতুন শপথ নিই। সোশ্যাল মিডিয়ার সেই ফাঁপা, মেকি ও নিখুঁত জীবনের মিথ্যা ছবির মরীচিকা ভেঙে আমরা বাস্তব জীবনে ফিরে আসি। আমাদের মা-বাবাকে সময় দিই, জায়নামাজকে চোখের পানিতে ভেজাই, আর আমাদের হাতের ডিভাইসটিকে বানাই জান্নাত অর্জনের এক অনন্য হাতিয়ার

কিয়ামতের দিন যখন আমাদের ডিজিটাল টাইমলাইন আল্লাহর সামনে ওপেন করা হবে, তখন যেন আমাদের লজ্জিত হতে না হয়; বরং পরম তৃপ্তিতে ও খুশিতে আমাদের মুখ থেকে যেন বেরিয়ে আসেআলহামদুলিল্লাহ!

 

ডিজিটাল মুসলিমের ২০টি করণীয়

 

১. নিয়ত পরিশোধন করা: সোশ্যাল মিডিয়ায় যেকোনো ইসলামিক পোস্ট, লেখা বা কন্টেন্ট শেয়ার করার আগে নিশ্চিত হোন যে উদ্দেশ্য কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টি; মানুষের লাইক, ভিউ বা দ্বীনদার তকমা পাওয়া নয়

২. দিন শুরু হোক রবের স্মরণে: সকালে ঘুম থেকে জেগেই প্রথম কাজ হিসেবে ফোনের নোটিফিকেশন চেক না করে, ঘুম থেকে ওঠার দোয়া ও আজকার পড়ার অভ্যাস করা

৩. স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করা: প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের একটি সর্বোচ্চ সময়সীমা (যেমন: ৩০-৪৫ মিনিট) নির্দিষ্ট করে অ্যাপে ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং বা টাইম ট্র্যাকার সেট করা

৪. বিছানায় ফোন নিষিদ্ধ করা: রাতে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন দূরে রাখা এবং বিছানায় কোনো অবস্থাতেই ফোন বা স্ক্রিন না ছোঁয়া

৫. দৃষ্টির ডিজিটাল হেফাজত: হোমপেজে কোনো অশ্লীল বা অর্ধনগ্ন ছবি/ভিডিও ভেসে আসবামাত্রই দৃষ্টি নত করার নিয়তে দ্রুত স্ক্রল করে চলে যাওয়া বা কন্টেন্টটি Not Interested দেওয়া

৬. তথ্য যাচাই করা (Fact Checking): যেকোনো চাঞ্চল্যকর খবর, ধর্মীয় ফতোয়া বা স্ক্যান্ডালের পোস্ট দেখামাত্রই শেয়ার না করে, কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা

৭. গীবত ও ট্রোল থেকে দূরে থাকা: কমেন্ট বক্সে কোনো ব্যক্তি, সমাজ বা গোষ্ঠীকে নিয়ে উপহাস, ট্রোল ও ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে নিজের আঙুলকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা

৮. ফজর ও তাহাজ্জুদের সুরক্ষা: রাত জেগে অর্থহীন স্ক্রলিং বন্ধ করা, যাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো এবং ফজরের ফরজ নামাজ জামায়াতে আদায় করা সহজ হয়

৯. অনাবশ্যক পেজ আনফলো করা: ফ্রেন্ডলিস্ট ও ফলোয়িং লিস্ট থেকে সমস্ত চটকদার, অশ্লীল, মিউজিক ও লাইফস্টাইল প্রদর্শনকারী পেজ/আইডি আনফলো বা ব্লক করে দেওয়া

১০. টাইমলাইনকে সাদাকায়ে জারিয়াহ বানানো: নিজের প্রোফাইলকে এমনভাবে সাজানো যাতে সেখানে উপকারী জ্ঞান, সুন্দর আখলাক এবং সহিহ দ্বীনি রিমাইন্ডার ছাড়া অন্য কিছু না থাকে

১১. ডিজিটাল ওজু বজায় রাখা: ওজু অবস্থায় স্ক্রিন ব্যবহার করার চেষ্টা করা, কারণ ওজু মানুষের ভেতর এক আধ্যাত্মিক পাহারাদার তৈরি করে, যা গুনাহ থেকে বাঁচতে সাহায্য করে

১২. কিবোর্ডের লাগাম টানা: কোনো তর্কমূলক পোস্টে নিজের মত সঠিক হলেও শুধু অনর্থক ঝগড়া এড়ানোর উদ্দেশ্যে কমেন্ট করা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া

১৩. গোপন গুনাহ পরিহার করা: যখন ঘরে কেউ থাকবে না, তখন নিজের ডিভাইস ও ইন্টারনেট সংযোগকে আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) দিয়ে পাহারা দেওয়া

১৪. বাস্তব সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া: পরিবার, মা-বাবা এবং বন্ধুদের সাথে সময় কাটানোর সময় ফোন সম্পূর্ণ সাইলেন্ট বা দূরে রাখার অভ্যাস করা

১৫. ডিজিটাল ডিটক্স (Digital Detox): সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একটা পুরো দিন (যেমন: শুক্রবার) সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইন্টারনেট থেকে সম্পূর্ণ অফলাইনে থাকার অনুশীলন করা

১৬. ইবাদতের মুহূর্তে ক্যামেরা বন্ধ: ওমরাহ, নামাজ, দোয়া কিংবা কোনো দান-সদকার মুহূর্তগুলোকে ক্যামেরাবন্দি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকা

১৭. কুপ্রভাব ও হাসাদ থেকে বাঁচা: নিজের দামি পোশাক, গাড়ি, রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস বা সুখী জীবনের ছবি প্রতিনিয়ত পোস্ট করে অন্যের মনে হিংসা বা হতাশা তৈরি না করা

১৮. ইসলামিক অ্যাপসের সঠিক ব্যবহার: ফোনে অন্তত একটি করে নির্ভরযোগ্য আল-কোরআন, হাদিস এবং দৈনিক দোয়ার অ্যাপ রাখা এবং প্রতিদিন তা পড়ার রুটিন করা

১৯. চলমান পাপের (গুনাহে জারিয়া) ভয় রাখা: এমন কোনো গান, মিম বা মুভি ক্লিপ শেয়ার না করা, যা নিজের মৃত্যুর পরও মানুষের স্ক্রিনে ভেসে বেড়াবে এবং কবরে গুনাহের মিটার সচল রাখবে

২০. প্রতি রাতে ডিজিটাল হিসাব মেলানো: ঘুমাতে যাওয়ার আগে নিজের মনকে প্রশ্ন করাআজ আমার আঙুলগুলো স্ক্রিনে যা যা করেছে, তা কি আমার আমলনামায় সওয়াব লিখেছে নাকি গুনাহ?

 

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ইসলামী নীতিমালা

 

  • ইখলাস বা একনিষ্ঠতা (Sincerity): ভার্চুয়াল জগতের সমস্ত ভালো কাজের মূল ভিত্তি হবে ইখলাস। লোকদেখানো এবং রিয়া-মুক্ত আমলই কেবল আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য
  • দৃষ্টির হিফাযত (Guarding the Gaze): ডিজিটাল স্ক্রিনের ক্ষেত্রেও বাস্তব জীবনের মতোই দৃষ্টি সংযত রাখার বিধান প্রযোজ্য। ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো হারাম দৃশ্য বা ছবির দিকে তাকানো চোখের জিনা
  • আমানতদারিতা ও সত্যবাদিতা (Truthfulness): মিথ্যা বা আংশিক সত্য কন্টেন্ট তৈরি, ভুয়া থাম্বনেইল ব্যবহার কিংবা ক্লিকবেইট হেডিং দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
  • আখলাক ও শালীনতা (Modesty in Speech): কমেন্ট বক্সে কিংবা ইনবক্সে কথা বলার সময় নম্রতা, ভদ্রতা ও শালীন ভাষা বজায় রাখা প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব। গালিগালাজ মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়
  • সময়ের মূল্য (Value of Time): সময় আল্লাহর দেওয়া এক অনন্য আমানত। উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিংয়ের মাধ্যমে জীবনের সোনালী সময় নষ্ট করা অপচয় এবং ধোঁকার শামিল

আত্মমূল্যায়ন চেকলিস্ট

(প্রতি সপ্তাহ বা মাসে নিজের ডিজিটাল জীবনকে এই ছকের আলোকে মূল্যায়ন করুন)

মূল্যায়ন সূচক

হ্যাঁ

না

আংশিক

১. আমি কি আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে স্ক্রিন না ছুয়ে মাশনূন দোয়া পড়েছি?

২. সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের কারণে আমার কোনো ওয়াক্তের নামাজ কাযা বা দেরি হয়েছে কি?

৩. আজ আমি কোনো রিলস, শর্টস বা পোস্টে দৃষ্টির অবাধ্যতা করেছি কি?

৪. কমেন্ট বক্সে কাউকে অপমান বা কোনো অনর্থক বিতর্কে জড়িয়েছি কি?

৫. আমার টাইমলাইনে আজ এমন কিছু শেয়ার হয়েছে কি, যা সাদাকায়ে জারিয়াহ হতে পারে?

৬. আমি কি কোনো তথ্য যাচাই না করে আজ লাইক বা শেয়ার করেছি?

৭. রাত জাগা স্ক্রলিংয়ের কারণে আমার ফজর বা তাহাজ্জুদ কি বিঘ্নিত হয়েছে?

 

নির্বাচিত কোরআনের আয়াত

১. দৃষ্টি নত রাখার নির্দেশ:

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩০)

২. তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব:

হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও, যাতে অজ্ঞাতসারে তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো। (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৬)

৩. প্রত্যেকটি অঙ্গের জবাবদিহিতা:

নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তরের প্রত্যেকটি সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) কৈফিয়ত তলব করা হবে। (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৬)

৪. গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু আল্লাহর জ্ঞানে:

তিনি জানেন চোখের খেয়ানত (কুদৃষ্টি) এবং অন্তরের গোপন রহস্য। (সূরা গাফির, আয়াত: ১৯)

নির্বাচিত সহিহ হাদিস

১. জিহ্বা ও হাতের নিরাপত্তা:

রাসূলুল্লাহ বলেছেন: মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিব (মুখ) এবং হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০)

২. ছোট গুনাহের ভয়:

রাসূলুল্লাহ বলেছেন: তোমরা ছোট ছোট গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, তা মানুষের ওপর জমা হতে হতে একসময় তাকে ধ্বংস করে দেয়। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৩৮৫৫)

৩. কলল্যাণের দিকে আহ্বানের প্রতিদান:

রাসূলুল্লাহ বলেছেন: যে ব্যক্তি কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সে তার অনুসারীদের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, অথচ তাদের সওয়াবের কোনো কমতি হবে না। (সহিহ মুসলিম, ২৬৭৪)

৪. অন্তরের কলুষতা:

রাসূলুল্লাহ বলেছেন: বান্দা যখন একটি গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। এরপর সে যখন তাওবা করে, তখন তার অন্তরটি আবার পরিষ্কার হয়ে যায়। (সূনান আত-তিরমিযী, হাদিস: ৩৩৩৪)

 

"স্মার্টফোনের স্ক্রিনের আলো সাময়িক, তা কয়েক ঘণ্টার চার্জ শেষ হলেই নিভে যায়; কিন্তু ঈমানের আলো চিরস্থায়ী, যা কবরের অন্ধকার থেকে শুরু করে হাশরের ময়দান পর্যন্ত আমাদের জান্নাতের পথ দেখাবে।"

হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই হাতের ডিভাইসগুলোকে আমাদের ধ্বংসের কারণ না বানিয়ে, জান্নাত অর্জনের এবং আপনার দ্বীনের খিদমতের এক একটি আলোকবর্তিকা বানিয়ে দিন। আমীন

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

যখন স্ক্রিন কালো হবে, তখন আপনার পাশে কে থাকবে?

 

বইটির শেষ পৃষ্ঠাটি আপনি যখন ওল্টাচ্ছেন, ঠিক এই মুহূর্তে আপনার ফোনের স্ক্রিনটি হয়তো টেবিলের ওপরে অলসভাবে জ্বলছে। হয়তো এখনই কোনো নতুন নোটিফিকেশনের টুংটাং শব্দে আপনার মনটা আবার চঞ্চল হয়ে উঠতে চাইছে

কিন্তু একটিবার ভাবুন, আজ রাতে যদি আপনার চোখের পাতা আর কোনোদিন না খোলে? মৃত্যুর পর যখন আপনার এই আইডিটা 'মেমোরিয়াল পেজ'-এ রূপান্তর হবে, তখন আপনার রেখে যাওয়া ডিজিটাল পদচিহ্নগুলো আপনার কবরে কী পাঠাবে? রহমতের হাওয়া, নাকি গুনাহের অবিরাম স্রোত?

সোশ্যাল মিডিয়ার ওপারে এক সুবিশাল পৃথিবী আছে, যা আল্লাহর নূর দিয়ে সাজানো। আপনি কি আজীবন ওই পাঁচ ইঞ্চির প্লাস্টিক আর কাঁচের খাঁচায় বন্দি থেকে নিজের যৌবন, মেধা আর ঈমানকে সমাহিত করবেন? নাকি শক্ত হাতে এই অদৃশ্য শৃঙ্খল ভেঙে আল্লাহর আরশের নিচে নিজের নাম লেখাবেন?

মানুষের ওয়ালে ভ্যালিডেশন খোঁজার দিন এবার শেষ হোক। কিয়ামতের দিন যখন আপনার ডিজিটাল টাইমলাইন লক্ষ-কোটি মানুষের সামনে প্লে করা হবে, সেই দিনটির কথা স্মরণ করে আজই আপনার কিবোর্ডের লাগাম টেনে ধরুন। আজই ওজু করে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আপনার রবের কাছে কেঁদে বলুনইয়া রব, আমি মরীচিকার পেছনে ছুটেছিলাম, আমি আবার আপনার আলোয় ফিরে এলাম।

বইটি এখানে শেষ হচ্ছে, কিন্তু আপনার জীবনের এক নতুন, পবিত্র ও জাগরণী অধ্যায়ের শুরু হচ্ছে ঠিক এখন থেকে। ফোনটা লক করুন, বুক ভরে একটা লম্বা শ্বাস নিন এবং চোখ বন্ধ করে অনুভব করুনআল্লাহ আপনাকে দেখছেন, এবং তিনি আপনার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছেন

নিশ্চয়ই, স্ক্রিনের ওপারে এক অনন্ত জান্নাত আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। সিদ্ধান্ত এখন সম্পূর্ণ আপনার!

 

 

 


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.