১. আপনি কি দেখেছেন(১) তাকে, যে দ্বীনকে(২) অস্বীকার করে?
(১) এখানে বাহ্যত সম্বোধন করা হয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। কিন্তু কুরআনে বর্ণনাভঙ্গী অনুযায়ী দেখা যায়, এসব ক্ষেত্রে সাধারণত প্রত্যেক জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনা সম্পন্ন লোকদেরকেই এ সম্বোধন করা হয়ে থাকে। আর দেখা মানে চোখ দিয়ে দেখাও হয়। কারণ সামনে দিকে লোকদের যে অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে তা প্রত্যেক প্রত্যক্ষকারী স্বচক্ষে দেখে নিতে পারে। আবার এর মানে জানা, বুঝা ও চিন্তা-ভাবনা করাও হতে পারে। [ফাতহুল কাদীর]
(২) এ আয়াতে “আদ-দীন” শব্দটির অর্থ আখেরাতে কর্মফল দান এবং বিচার। অধিকাংশ মুফাসসিররা এমতটিই গ্ৰহণ করেছেন। [ইবন কাসীর, কুরতুবী, মুয়াস্সার]
২. সে তো সে-ই, যে ইয়াতীমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়।(১)
(১) এখানে يَدُعُّ বলা হয়েছে। এর অর্থ, রূঢ়ভাবে তাড়ানো, কঠোরভাবে দূর করে দেয়া। এতিমদের প্রতি অসদাচরণ করা, তাদের প্রতি দয়া না করে কঠোরভাবে ধিক্কার ও যুলুম করা, তাদেরকে খাদ্য দান না করা এবং তাদের হক আদায় না করাই এখানে উদ্দেশ্য। [মুয়াস্সার, ইবন কাসীর, তাবারী] জাহিলিয়াতের যুগে এতিম ও নারীদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হত। আর বলা হত, যারা তীর-বর্শা নিক্ষেপ করে এবং তরবারী দিয়ে যুদ্ধ করে তারাই শুধু সম্পত্তি পাবে। কিন্তু পরবর্তীতে ইসলাম এ ধরনের প্রথা বাতিল করে দিয়েছে। [কুরতুবী]
৩. আর সে উদ্বুদ্ধ করে না(১) মিসকীনদের খাদ্য দানে।
(১) لَا يَحُضُّ শব্দের মানে হচ্ছে, সে নিজেকে উদ্ধৃদ্ধ করে না, নিজের পরিবারের লোকদেরকেও মিসকিনের খাবার দিতে উদ্ধৃদ্ধ করে না এবং অন্যদেরকেও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করে না যে, সমাজে যেসব গরীব ও অভাবী লোক অনাহারে মারা যাচ্ছে তাদের হক আদায় করো এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য কিছু করো। কারণ তারা কৃপণ এবং আখেরাতে অবিশ্বাসী। [ফাতহুল কাদীর]
৪. কাজেই দুর্ভোগ সে সালাত আদায়কারীদের,
৫। যারা তাদের নামাযে অমনোযোগী। [1]
[1] নামাযে অমনোযোগী বা উদাসীন বলে ঐ সমস্ত লোকদেরকে বোঝানো হয়েছে, যারা মোটেই নাযায পড়ে না অথবা প্রথম দিকে পড়ত অতঃপর তাদের মধ্যে অলসতা এসে পড়েছে অথবা নামায যথাসময়ে আদায় করে না; বরং যখন মন চায় তখন পড়ে নেয় অথবা দেরী করে আদায় করতে অভ্যাসী হয় অথবা বিনয়-নম্রতার (ও একাগ্রতার) সাথে নামায পড়ে না ইত্যাদি। এই সমস্ত প্রকার ত্রুটি ঐ অর্থের শামিল। অতএব নামাযের ব্যাপারে উক্ত সকল আচরণ হতে বাঁচা প্রয়োজন। এখানে এ উল্লেখ করাতে এ কথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, এ সমস্ত বদ অভ্যাসে অভ্যস্ত ঐ সব লোকই হতে পারে, যারা আখেরাতের হিসাব ও প্রতিদানের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করে না। এ জন্যই মুনাফিকদের একটি গুণ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ‘‘যখন তারা (মুনাফিকরা) নামাযে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সাথে, কেবল লোক-দেখানোর জন্য দাঁড়ায় এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে থাকে।’’(সূরা নিসা ১৪২ আয়াত)
৬. যারা লোক দেখানোর জন্য তা করে(১),
(১) এটা মুনাফিকদের অবস্থা। তারা লোক দেখানোর জন্যে এবং মুসলিম হওয়ার দাবী সপ্রমাণ করার জন্য সালাত পড়ে। কিন্তু সালাত যে ফরয, এ বিষয়ে তারা বিশ্বাসী নয়। ফলে সময়ের প্রতিও লক্ষ্য রাখে না এবং আসল সালাতেরও খেয়াল রাখে না। লোক দেখানোর জায়গা হলে পড়ে, নতুবা ছেড়ে দেয়। আর সালাত আদায় করলেও এর ওয়াজিবসমূহ, শর্ত ইত্যাদি পূর্ণ করে না। আসল সালাতের প্রতিই ভ্রুক্ষেপ না করা মুনাফিকদের অভ্যাস এবং سَاهُون শব্দের আসল অর্থ তাই। সালাতের মধ্যে কিছু ভুল-ভ্ৰান্তি হয়ে যাওয়ার কথা এখানে বোঝানো হয়নি। কেননা, এজন্যে জাহান্নামের শাস্তি হতে পারে না। এটা উদ্দেশ্য হলে (عَنْ صَلَاتِهِمْ) এর পরিবর্তে (فِىْ صَلَاتِهِمْ) বলা হত। সহীহ হাদীসসমূহে প্রমাণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনেও একাধিকবার সালাতের মধ্যে ভুলচুক হয়ে গিয়েছিল। [কুরতুবী, ইবন কাসীর]
৭. এবং মাউন(১) প্ৰদান করতে বিরত থাকে।
(১) ماعون শব্দের অর্থ অধিকাংশ মুফাসসিরদের নিকট যৎকিঞ্চিৎ ও সামান্য উপকারী বস্তু। মূলত: মাউন ছোট ও সামান্য পরিমাণ জিনিসকে বলা হয়। এমন ধরনের জিনিস যা লোকদের কোন কাজে লাগে বা এর থেকে তারা ফায়দা অর্জন করতে পারে। অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে, সাধারণত প্রতিবেশীরা একজন আর একজনের কাছ সাধারণ মানবতারূপে গণ্য হয়; যথা কুড়াল, কোদাল অথবা রান্না-বান্নার পাত্ৰ এ সবই মাউনের অন্তর্ভুক্ত। প্রয়োজনে এসব জিনিস প্রতিবেশীর কাছ থেকে চেয়ে নেয়া দোষণীয় মনে করা হয় না। কেউ এগুলো দিতে অস্বীকৃত হলে তাকে বড় কৃপণ ও নীচ মনে করা হয়। আবার কারও কারও মতে আলোচ্য আয়াতে ماعون বলে যাকাত বোঝানো হয়েছে। যাকাতকে ماعون বলার কারণ সম্ভবত এই যে, যাকাত পরিমাণে আসল অর্থের তুলনায় খুবই কম। অর্থাৎ চল্লিশ ভাগের এক ভাগ-হয়ে থাকে। ব্যবহার্য জিনিসপত্র অপরকে দেয়া খুব সওয়াবের কাজ এবং মানবতার দিক দিয়ে জরুরি। কোন কোন হাদীসে ماعون এর তাফসীর ব্যবহার্য জিনিস, যেমন: বালতি, পাত্র ইত্যাদি করা হয়েছে। [আবু দাউদ: ১৬৫৭] [আদওয়াউল বায়ান, মুয়াস্সার, ফাতহুল কাদীর]
সংগ্রহ : https://hadithbd.com/quran/tafsir/?sura=107

Leave a Comment